মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নতুন করে ভেঙে পড়েছে। গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালীতে অন্তত তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার পর পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, যা জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করেছে। মার্কিন ও সামুদ্রিক কর্মকর্তাদের মতে, এই হামলায় একটি সৌদি তেল ট্যাঙ্কার এবং একটি কাতারি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায়, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থেকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে, যা গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (MOU) অনুযায়ী তেহরানকে তার তেল রপ্তানি পুনরায় শুরু করার সুযোগ দিয়েছিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে, হরমুজ প্রণালীকে ব্যবহার করে ইরান এখনও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা রাখে, তবে এই উচ্চ-ঝুঁকির কৌশল তাদের জন্য কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ইরানের হামলার পরদিন, বুধবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) ঘোষণা করে যে তারা ইরানের ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ছিল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) দ্বারা ব্যবহৃত ৬০টিরও বেশি ছোট নৌকা, যা হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, তারা বৃহস্পতিবার আরও প্রায় ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। সেন্টকমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক জলপথে নিরীহ বেসামরিক ক্রু বহনকারী বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর জন্য ইরানকে 'চড়া মূল্য' দিতে হবে। এই ধারাবাহিক হামলাগুলো আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও গভীর করার ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মহলকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
মার্কিন হামলার জবাবে ইরানও বসে থাকেনি। বুধবার তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যার ফলে বাহরাইন ও কুয়েতে বিমান হামলার সাইরেন ও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। বৃহস্পতিবারও আরও হামলার খবর মিলেছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল, যা যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর পুনরায় শুরু হয়েছিল, তা আবারও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বলে ব্লুমবার্গ বৃহস্পতিবার শিপিং ট্র্যাকিং ডেটার বরাত দিয়ে জানিয়েছে। এই পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়।
এই ক্রমবর্ধমান সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায়, সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা মারিস্কস (MARISKS) বুধবার সতর্ক করে বলেছে যে, এই পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ 'সরাসরি সামরিক সংঘাতের' দিকে ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তুরস্কের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন যে, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক এখন 'শেষ', এবং তাদের (তেহরান) সঙ্গে কাজ করা 'শুধুই সময় নষ্ট'। অন্যদিকে, চীন ও কাতার অবিলম্বে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস তেহরানকে ওয়াশিংটনকে উস্কানি দেওয়া বন্ধ করতে এবং জাহাজে হামলা বন্ধ করতে আহ্বান জানিয়েছেন। এই আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াগুলো বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে।
হরমুজ প্রণালী, যা যুদ্ধের আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস উপসাগর থেকে বিশ্বের অন্যান্য অংশে পরিবহন করত, তার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করছে ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি সহ বেশ কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর ইরান কার্যকরভাবে এই প্রণালী বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে, ইরান প্রণালীতে আটকে পড়া প্রায় এক ডজন জাহাজে হামলা চালায়, যার পর একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। তবে, মঙ্গলবারের হামলার আগ পর্যন্ত শান্তি আলোচনা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘমেয়াদী শিথিলতা এবং ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সহ অনেক অমীমাংসিত ইস্যুতে সামান্যই অগ্রগতি লাভ করেছিল।
কূটনৈতিক অগ্রগতি যখন স্থবির হয়ে পড়ে, তখন ইরান বারবার হরমুজকে আলোচনার ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলিতে হামলা চালানোকে তেহরান ওয়াশিংটনকে চাপ দেওয়ার এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি উপায় হিসাবে দেখে। এই কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে তেহরান বোঝাতে চায় যে, সংঘাতের ব্যয় সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে বহন করতে হবে। এটি ইরানের একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল, যার মাধ্যমে তারা আঞ্চলিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে নিজেদের দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চায়।
বারবার মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেহরান সরাসরি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে পরাস্ত করতে সক্ষম না হওয়ায়, তারা হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ব্যাঘাত ঘটানো এবং আঞ্চলিক মিত্রদের উপর হামলা চালানোর মতো অপ্রতিসম কৌশল অবলম্বন করছে। এই কৌশলগত দুর্বলতা ইরানকে এমন একটি অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে যেখানে তাদের প্রধান অস্ত্র হলো অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা। তবে, এই কৌশল কতটা সফল হবে এবং এর চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
এই চলমান সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ইরানের এই উচ্চ-ঝুঁকির কৌশল তাদের জন্য কতটা ফলপ্রসূ হবে নাকি উল্টো ফল দেবে, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। তবে এটি স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ আবারও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, এবং এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।