২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে উঠেছেন নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার আরলিং হালান্ড। তার ক্ষিপ্র গতি, অদম্য শক্তি এবং গোল করার সহজাত ক্ষমতা প্রতিপক্ষ দলগুলোকে রীতিমতো হিমশিম খাইয়ে দিচ্ছে। আগামী শনিবার কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে নরওয়ে, যেখানে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার লড়াইয়ে হালান্ডকে থামানোর দায়িত্ব কে পাবেন, তা নিয়ে ফুটবল মহলে চলছে জোর আলোচনা ও বিশ্লেষণ।
ইংলিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য অ্যাথলেটিক'-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই গুরুত্বপূর্ণ মিশনে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভরসা হতে পারেন ২.০১ মিটার লম্বা ডিফেন্ডার ড্যান বার্ন। ৩৪ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডারের উচ্চতা হালান্ডের (১.৯৫ মিটার) চেয়েও বেশি, যা তাকে চলতি বিশ্বকাপের সবচেয়ে লম্বা আউটফিল্ড খেলোয়াড়দের একজন করে তুলেছে। তার সমান উচ্চতার খেলোয়াড় হিসেবে রয়েছেন বসনিয়ার ডিফেন্ডার স্টেফান আদেগিচ এবং কলম্বিয়ার গোলরক্ষক আলভারো মনতেরো। কেবল অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক ফ্লোরিয়ান উইগেলে (২.০৫ মিটার) উচ্চতায় তার চেয়ে এগিয়ে।
'দ্য অ্যাথলেটিক' আরও উল্লেখ করেছে যে, ড্যান বার্ন খুব কাছ থেকে প্রতিপক্ষকে মার্ক করতে পারদর্শী। তার ব্যতিক্রমী উচ্চতা এবং শারীরিক গঠন তাকে হালান্ডের মতো শক্তিশালী স্ট্রাইকারকে শারীরিক লড়াইয়ে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো অল্প কয়েকজন ডিফেন্ডারের একজন করে তুলেছে। এর ফলে হালান্ডের স্বাভাবিক গতি কমিয়ে দেওয়া এবং বল পেয়ে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন করে তোলা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে, যা ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের জন্য একটি বড় স্বস্তি হতে পারে।
ড্যান বার্ন বর্তমানে নিউক্যাসেল ইউনাইটেডে খেলেন, যেখানে তার সতীর্থ হিসেবে রয়েছেন ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারেস। ২০২২ সালে ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর গত মৌসুমে তিনি ৪৪টি ম্যাচ খেলেছেন, যার মধ্যে ৩৯টিতেই ছিলেন শুরুর একাদশে। তবে ইংল্যান্ড জাতীয় দলে তিনি নিয়মিত একাদশের সদস্য নন। গত বছর তিনি মূলত বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ইউরোপীয় ম্যাচগুলোতে শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়েছিলেন, যা তার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে একটি সীমাবদ্ধতা তৈরি করে।
চলতি বিশ্বকাপে তিনি কেবল মেক্সিকোর বিপক্ষে শেষ ১৫ মিনিট মাঠে নেমেছিলেন, কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি সকলের নজর কাড়েন। ম্যাচের শেষ দিকে রাউল হিমেনেজের একটি বিপজ্জনক বাইসাইকেল কিক হেড দিয়ে প্রতিহত করে তিনি দলের পতন রোধ করেন। এছাড়া ওই ম্যাচেই তিনি পুরো ম্যাচে সর্বোচ্চ ছয়টি ক্লিয়ারেন্স করে নিজের রক্ষণাত্মক দক্ষতা প্রমাণ করেন, যা তার উপর কোয়ার্টার ফাইনালের দায়িত্ব চাপানোর ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
'দ্য অ্যাথলেটিক' আরও উল্লেখ করেছে যে, হালান্ডের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে ড্যান বার্নের। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে নিউক্যাসলের বিপক্ষে হালান্ড ১০টি ম্যাচ খেললেও গোল করেছেন মাত্র একটি। প্রিমিয়ার লিগে অন্তত পাঁচবার মুখোমুখি হওয়া প্রতিপক্ষগুলোর মধ্যে এটি হালান্ডের সবচেয়ে কম গোলের রেকর্ড, যা বার্নের রক্ষণাত্মক দক্ষতার একটি প্রমাণ। তবে পরিসংখ্যান বলছে, এই লড়াইটি বার্নের জন্য খুব সহজ ছিল না। হালান্ডের বিপক্ষে আট ম্যাচে বার্ন খেললেও নিউক্যাসেল জিততে পারেনি – ছয়টিতে হেরেছে এবং দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। এর মধ্যে চার ম্যাচে বার্ন খেলেছিলেন লেফট-ব্যাক হিসেবে, তাই সবসময় তিনি সরাসরি হালান্ডকে মার্ক করার সুযোগ পাননি।
সংবাদমাধ্যমটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আকাশে বলের লড়াই ও শারীরিক সংঘর্ষে বার্নের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া হালান্ডের জন্য সহজ হবে না। তবে নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকারের গতি, দ্রুত দৌড় এবং ফাঁকা জায়গায় ঢুকে পড়ার দক্ষতা ইংলিশ ডিফেন্ডারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। নিউক্যাসলের বিপক্ষে হালান্ডের একমাত্র গোলটিও এসেছিল বার্নকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত বক্সে ঢুকে নিচু ক্রস থেকে বল জালে পাঠানোর মাধ্যমে, যা হালান্ডের এই ধরনের কৌশলের বিরুদ্ধে বার্নের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করে।
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আগামী শনিবার মিয়ামি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে নরওয়ে ও ইংল্যান্ড। এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ড্যান বার্ন কতটা সফলভাবে আরলিং হালান্ডকে আটকে রাখতে পারেন, সেটিই হতে পারে ম্যাচের অন্যতম নির্ধারণী বিষয়। এই ব্যক্তিগত দ্বৈরথ কেবল দুটি দলের ভাগ্যই নয়, বরং ফুটবলপ্রেমীদের মনেও গভীর ছাপ ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।