বাংলাদেশের জ্ঞান ও গবেষণা ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদারের ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা প্রায় দশ হাজার বই সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই বিশাল গ্রন্থসম্ভার বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) একটি বিশেষ কর্নার বা পৃথক গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হবে, যা দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত ৮ জুলাই, ২০২৬ তারিখে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদের সঙ্গে আবদুল হাই শিকদারের এক বৈঠকে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
উক্ত বৈঠকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. শওকাত আলী এবং ইউজিসির জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভার আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল কীভাবে এই অমূল্য গ্রন্থসংগ্রহকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা যায় এবং তা গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য করা যায়। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ এই উদ্যোগকে শুধু একজন ব্যক্তির বইয়ের সংগ্রহ নয়, বরং দেশের জ্ঞান ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বইগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণের যাবতীয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন, যাতে দ্রুততম সময়ে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ তার বক্তব্যে ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন যে, এটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা দুর্লভ ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ সংরক্ষণে একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। তিনি আরও জানান যে, এ ধরনের মহতী উদ্যোগে ইউজিসি নীতিগত সহায়তা প্রদান করতে প্রস্তুত। কেবল বই সংরক্ষণই নয়, দুর্লভ এই গ্রন্থগুলোকে পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল আর্কাইভে রূপান্তরের উপরও তিনি জোর দিয়েছেন, যাতে দেশের যেকোনো প্রান্তের গবেষক ও পাঠক সহজেই এই জ্ঞানভাণ্ডার ব্যবহার করতে পারেন এবং গবেষণার কাজে লাগাতে পারেন। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
আবদুল হাই শিকদার তার সংগ্রহের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে জানান যে, তার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, বিশ্ব ইতিহাস, গবেষণা, প্রবন্ধ, অনুবাদ সাহিত্য, শিশুসাহিত্য, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ের প্রায় দশ হাজার বই রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার বই অত্যন্ত দুর্লভ এবং দ্রুত সংরক্ষণ না করা হলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই বইগুলোর অনেকগুলোই বর্তমানে বাজারে আর পাওয়া যায় না, যা তাদের ঐতিহাসিক ও জ্ঞানগত মূল্য আরও বাড়িয়ে তোলে। এই মূল্যবান সংগ্রহকে সুরক্ষিত রাখা তাই অত্যন্ত জরুরি একটি কাজ।
নিজের সংগ্রহের উৎস সম্পর্কে আবদুল হাই শিকদার জানান যে, এই বইগুলোর একটি বড় অংশ তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে তার বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন। বাকি বইগুলো তিনি কয়েক দশক ধরে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অত্যন্ত যত্ন সহকারে সংগ্রহ করেছেন। তার একান্ত ইচ্ছা ছিল এই পুরো সংগ্রহ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করা, যাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকরা এই বইগুলো ব্যবহার করে উপকৃত হতে পারেন এবং জ্ঞানচর্চায় নতুন প্রেরণা লাভ করেন। তার এই দানশীলতা দেশের শিক্ষাঙ্গনে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করবে।
ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ সংরক্ষণের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আবদুল হাই শিকদার ভাষাবিদ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর গ্রন্থাগারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, সংরক্ষণের অভাবে তার সংগ্রহের বহু দুর্লভ বই একসময় ভাঙারির দোকানে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল এবং তার গ্রন্থাগারের জায়গায় তেলের ঘানির দোকান গড়ে উঠেছিল। তিনি এমন ঘটনাকে দেশের জ্ঞান-ঐতিহ্যের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন যে, এ ধরনের বিপর্যয় রোধে ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ সংরক্ষণে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য।
আবদুল হাই শিকদার আরও জানান যে, তিনি ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ আলী আহসানের ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করার ঘটনা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই তিনি তার নিজের সংগ্রহ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার গ্রামের বাড়ি রংপুর বিভাগে হওয়ায়, তিনি চান তার এই জ্ঞানভাণ্ডার এই অঞ্চলের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য সহজলভ্য হোক এবং তাদের জ্ঞানচর্চায় সহায়ক ভূমিকা পালন করুক। এই উদ্যোগ আঞ্চলিক জ্ঞানচর্চার বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ব্যক্তিগত জ্ঞানসাধনা ও সংগ্রহের প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞান সংরক্ষণের একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। এর ফলে শুধু বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই নন, বরং দেশজুড়ে গবেষকরাও এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার থেকে উপকৃত হতে পারবেন। ইউজিসির এই উদ্যোগ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্যক্তি পর্যায়েও ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ সংরক্ষণে অনুপ্রেরণা যোগাবে এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে আশা করা যায়।