বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রথমার্ধেই অপ্রত্যাশিতভাবে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মিশরের বিপক্ষে বিরতিতে ১-০ গোলে পিছিয়ে আছে লিওনেল স্কালোনির দল। মিশরীয় ফরোয়ার্ড ইব্রাহিমের দুর্দান্ত হেডে তারা এগিয়ে যায়, অন্যদিকে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি একটি গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি মিস করে দলকে আরও চাপে ফেলেছেন। এই ম্যাচের প্রথমার্ধ বিশ্বফুটবলের অন্যতম সেরা দলের জন্য বেশ হতাশাজনক ছিল, যেখানে মিশরের দৃঢ় প্রতিরক্ষা ও গোলরক্ষকের অসাধারণ পারফরম্যান্স তাদের এগিয়ে রেখেছে।
ম্যাচের ১৭তম মিনিটেই আর্জেন্টিনা প্রথম বড় ধাক্কা খায়। ডান প্রান্ত থেকে আত্তিয়ার নিখুঁত বাঁকানো ক্রসে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ অফসাইড ট্র্যাপ তৈরি করতে গিয়ে দ্বিধায় পড়েন। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ইব্রাহিম তাকে পেছনে ফেলে শক্তিশালী হেডে বল আর্জেন্টিনার জালে পাঠিয়ে মিশরকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। গোল হজমের পর লিওনেল মেসি রেফারির কাছে অফসাইডের দাবি জানালেও রিপ্লেতে দেখা যায়, গোলটি সম্পূর্ণ বৈধ ছিল। গোল হজমের মাত্র পাঁচ মিনিট পরই সমতায় ফেরার সোনালি সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। বক্সের ভেতরে তালিয়াফিকোকে ফাউল করলে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। কিন্তু স্পটকিক থেকে হতাশ করেন লিওনেল মেসি; তার দুর্বল শটটি গোলপোস্টের মাঝামাঝি ডানদিকে ছিল, যা সঠিক দিক অনুমান করে সহজেই আটকে দেন মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর।
এই পেনাল্টি মিসের মাধ্যমে বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক অনাকাঙ্ক্ষিত নতুন রেকর্ডের মালিক হন মেসি। টাইব্রেকার বাদ দিলে একক বিশ্বকাপ আসরে দুটি পেনাল্টি মিস করা প্রথম ফুটবলার এখন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিশ্বকাপে তার নেওয়া আটটি পেনাল্টির মধ্যে এটি ছিল চতুর্থ ব্যর্থ প্রচেষ্টা। ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা বলের দখল ধরে রেখে আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করলেও মিশরও পাল্টা আক্রমণে নিজেদের আত্মবিশ্বাসী প্রমাণ করে। দ্বিতীয় মিনিটেই এনজো ফার্নান্দেজ হাঁটুতে আঘাত পেলেও খেলা চালিয়ে যান, এবং চার মিনিটে মিডফিল্ডার আশুরও একটি ট্যাকলে আঘাত পেয়ে কিছুক্ষণ মাঠে শুয়ে থাকেন, যা খেলার গতি কিছুটা মন্থর করে।
ষষ্ঠ মিনিটে রদ্রিগো ডি পলের ভুল পাস থেকে সুযোগ তৈরি করে মিশর। জিকো বল কেড়ে নিয়ে আক্রমণ সাজালে ডান প্রান্তে হাসানকে ফাউল করে নিকোলাস তালিয়াফিকো। এরপর অষ্টম মিনিটে আত্তিয়ার বিপজ্জনক ক্রস লিসান্দ্রো মার্তিনেজ হেড করে ক্লিয়ার করেন। ম্যাচের ১১তম মিনিটে গোলের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। রদ্রিগো ডি পলের বাড়ানো বল থেকে মাত্র দুই গজ দূরে দাঁড়িয়ে এনজো ফার্নান্দেজ বল জালে পাঠাতে ব্যর্থ হন। যদিও পরে অফসাইডের পতাকা ওঠায় বড় বিপদ থেকে রক্ষা পায় মিশর, কিন্তু আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের দুর্বলতা সেখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর প্রথমার্ধের সবচেয়ে বড় নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে আর্জেন্টিনাকে হতাশ করেছেন। ২৭তম মিনিটে আবারও গোলের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে আর্জেন্টিনা। লিয়ান্দ্রো পারেদেসের পাস থেকে ডি পলের নিখুঁত ক্রসে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার নির্ভার অবস্থায় হেড নিলেও তা সরাসরি শোবেইরের হাতে জমা পড়ে। তার অসাধারণ ক্ষিপ্রতা ও সঠিক পজিশনিং আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডদের জন্য দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়।
৩২ মিনিটে প্রায় অসাধারণ এক ফ্রি-কিক থেকেই গোল পেয়ে যাচ্ছিলেন মেসি। প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে তার বাঁকানো শট ডিফেন্সের দেয়াল পেরিয়ে বাম পোস্টে আঘাত করে ফিরে আসে। প্রথমে কর্নারের সিদ্ধান্ত দিলেও ভিএআরের পর রেফারি সিদ্ধান্ত বদলান, কারণ গোলরক্ষক বল স্পর্শই করেননি। ৩৮ মিনিটে ডি পলের কাছ থেকে বল পেয়ে দূরপাল্লার শট নেন মেসি। তবে ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া সেই প্রচেষ্টা অনেক ওপরে দিয়ে চলে যায়। মাঠের ঘাসের অবস্থা নিয়ে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির আগের মন্তব্যও তখন আলোচনায় আসে, যা দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
৪১তম মিনিটে ম্যাচের সেরা সেভটি করেন মোস্তফা শোবেইর। তালিয়াফিকোর চমৎকার কাটব্যাক থেকে হুলিয়ান আলভারেজ বাঁ-পায়ে ১০ গজ দূর থেকে জোরালো শট নেন। গোল নিশ্চিত মনে হলেও অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় নিচু হয়ে বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে বল ঠেকিয়ে দেন মিশরের গোলরক্ষক। ৪৩ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে তালিয়াফিকো নিকট পোস্টে বল ছুঁয়ে দিলেও দূরের পোস্টে কেউ না থাকায় আরেকটি সুযোগ নষ্ট হয় আর্জেন্টিনার। প্রথমার্ধের যোগ করা পাঁচ মিনিটের প্রথম ভাগেও বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা একাধিক সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু মিশরের রক্ষণের দৃঢ়তা ভাঙতে ব্যর্থ হয়।
বিরতির বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা গোল শোধ করার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে গেলেও মিশরের সুসংগঠিত রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইরের দুরন্ত ফর্ম তাদের সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়। প্রথমার্ধের এই ফলাফল বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য দ্বিতীয়ার্ধে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। নিজেদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে হলে স্কালোনির দলকে দ্বিতীয়ার্ধে আরও আক্রমণাত্মক ও কার্যকর ফুটবল খেলতে হবে। অন্যদিকে, মিশর তাদের এই ঐতিহাসিক অগ্রগামিতা ধরে রাখার জন্য বদ্ধপরিকর থাকবে।