স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সম্পদ নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত কিছু তথ্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। এসব প্রতিবেদনে প্রতিমন্ত্রীর সম্পত্তির পরিমাণ ও তার ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তবে, নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া তাঁর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামা এবং পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে একটি ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, যা প্রকাশিত অভিযোগগুলোর ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহল এবং প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠরা বলছেন, একটি সুনির্দিষ্ট মহলের ইন্ধনে হলফনামার আংশিক তথ্য উপস্থাপন করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে, যা একজন জনপ্রতিনিধির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অপচেষ্টা মাত্র।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, বগুড়া-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং বর্তমান প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নামে মোট ১ হাজার ৮২৪ শতাংশ স্থাবর সম্পত্তি এবং ১২টি ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। অথচ, সম্প্রতি প্রচারিত একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর মোট সম্পত্তির মাত্র ৩১ শতাংশের তথ্য তুলে ধরা হয়, যা এই বিতর্কের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আংশিক তথ্য উপস্থাপনের কারণেই জনমনে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে এবং প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অসত্য অভিযোগ ছড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করছেন তাঁর সমর্থকরা। এই ধরনের একপেশে তথ্য পরিবেশন সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থী বলেও অনেকে মত দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মীর শাহে আলম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকেই ‘স্বার্থের সংঘাত’ (কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট) এড়াতে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। এই নীতি অনুসরণ করে তিনি তাঁর পারিবারিক ব্যবসার মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা থেকে লিখিতভাবে সরে দাঁড়িয়েছেন। বর্তমানে তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, তাঁর সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ কোনোভাবেই প্রভাব ফেলবে না। হলফনামায় উল্লেখিত প্রতিমন্ত্রীর ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—রোমা অটো রাইস মিল, রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেড, রূপসী ফ্লাওয়ার মিল, মীর সীমান্ত-দিগন্ত ফিলিং স্টেশন, মীর লাবনী-সুনাত ফিলিং স্টেশন, মীর দিগন্ত ট্রেডিং এজেন্সি, উত্তর বাংলা ওভারসিজ লিমিটেড, রূপসী কৃষি খামার, রূপসী মৎস্য খামার, রূপসী কংক্রিট ব্রিকস ফ্যাক্টরি, রূপসী মিনি কোল্ড স্টোরেজ এবং রূপসী প্রাণী খামার। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘকাল ধরে মীর পরিবারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ।
সম্প্রতি প্রতিমন্ত্রীর সম্পদ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ‘রোমা অটোরাইস মিল’ প্রসঙ্গে জানা গেছে, এটি ব্যবসার পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে জাতীয় নির্বাচনের আগেই বিক্রি করা হয়েছিল। গত ২ ফেব্রুয়ারি, নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ৪২ কোটি টাকায় মিলটি বিক্রি করা হয়। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা এলাকার ব্যবসায়ী রবিউল আলম, যিনি মিলটির ক্রেতা, এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গত ফেব্রুয়ারির শুরুতেই তিনি ৪২ কোটি টাকায় মিলটি ক্রয় করেছেন এবং মালামালসহ প্রতিষ্ঠানের সব দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। এই তথ্য স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, মিলটি প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর নতুন করে অর্জিত কোনো সম্পদ নয়, বরং নির্বাচনের আগেই এটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিক্রি করা হয়েছে।
এদিকে, প্রতিমন্ত্রীর নামে নতুন করে ২৪২ শতাংশ জমি কেনার যে দাবি বিভিন্ন মহলে উঠেছে, সেটিকেও ‘সম্পূর্ণ ভুল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন তাঁর প্রেস সেক্রেটারি আতিকুর রহমান। তিনি এক বিবৃতিতে জানান, আলোচিত জমিটি ব্যক্তি হিসেবে মীর শাহে আলমের নামে কেনা হয়নি, বরং এটি রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেডের নামে ক্রয় করা হয়েছে। প্রেস সেক্রেটারি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানের কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলমও একই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, প্রতিমন্ত্রীর পদ গ্রহণের পর থেকে তিনি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রমে অংশ নেন না এবং সকল সিদ্ধান্ত পরিচালনা পর্ষদ ও অন্যান্য সদস্যরা গ্রহণ করে থাকেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মীর পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলের একটি প্রতিষ্ঠিত ও সম্পদশালী পরিবার হিসেবে সুপরিচিত। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিপুল সম্পদের পাশাপাশি কৃষি, শিল্প এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের পারিবারিক ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। তাদের এই দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ঐতিহ্য এবং অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সম্পর্কে স্থানীয় জনগণ অবগত। এই প্রেক্ষাপটে, প্রতিমন্ত্রীর বর্তমান সম্পদের যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, তা তাঁর দীর্ঘদিনের পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা। নতুন করে সম্পদ অর্জনের অভিযোগের চেয়ে পারিবারিক ব্যবসার ধারাবাহিকতা এবং পুনর্বিন্যাসই এর পেছনের মূল কারণ।
শিবগঞ্জ উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “মীর শাহে আলম বহু বছর ধরেই একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি ব্যবসার মালিকানা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে আমরা জানি। তাঁর রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যেই এই ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।” একই মন্তব্য করে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুর রউফ রুবেল বলেন, “প্রকাশিত প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শিরোনামের সঙ্গে ভেতরের তথ্যের সামঞ্জস্য ছিল না। হলফনামার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পর্যালোচনা না করে আংশিক প্রকাশের মাধ্যমে একজন জনপ্রতিনিধির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই না করে এমন সংবাদ প্রকাশ করা উচিত নয়।” তাঁদের এই মন্তব্যগুলো বর্তমান বিতর্কের পেছনে অপপ্রচারের উদ্দেশ্যকেই ইঙ্গিত করে।
সর্বোপরি, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সম্পদ নিয়ে চলমান বিতর্কটি মূলত তথ্যের আংশিক উপস্থাপনা এবং অপপ্রচারের ফল বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তাঁর নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত হলফনামা এবং পারিবারিক ব্যবসার যথাযথ নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রকাশিত অভিযোগগুলোর অধিকাংশই ভিত্তিহীন। একজন জনপ্রতিনিধির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনই অসত্য বা আংশিক তথ্য পরিবেশন করে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করাও কাম্য নয়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।