রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকসমূহের পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা, জলদূষণ রোধ এবং একটি কার্যকর সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (৬ জুলাই) বাংলাদেশ সচিবালয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি এই নির্দেশ জারি করেন। এই বৈঠকটির মূল উদ্দেশ্য ছিল গুলশান-বনানী-বারিধারা-নিকুঞ্জ এলাকার বিভিন্ন ভবনের পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ ব্যবস্থা যাচাই এবং লেকগুলোকে দূষণমুক্ত করার সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করা।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেছেন যে, লেক থেকে বর্জ্য অপসারণ, জলদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সিটি কর্পোরেশন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই সমস্যাটি একক কোনো সংস্থার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন একটি বহুপাক্ষিক ও সুসংগঠিত কর্মপরিকল্পনা। এই সমন্বিত প্রয়াস ছাড়া টেকসই সমাধান অর্জন করা কঠিন হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে দেন।
বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন যে, লেকগুলোকে দূষণমুক্ত করার জন্য ইতোমধ্যে স্বল্প, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনাগুলোর অংশ হিসেবে, যেসব ভবনের পয়ঃবর্জ্য সরাসরি লেকগুলোতে পতিত হচ্ছে, সেগুলোকে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এই অবৈধ সংযোগগুলো বন্ধ করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। শহরের ক্রমবর্ধমান নগরায়ন এবং অপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে লেকগুলোর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাই এই পদক্ষেপগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লেকগুলোর পরিবেশ সুরক্ষায় পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনাগার (STP) স্থাপনের বিষয়টিও বৈঠকে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। আধুনিক ও কার্যকর STP স্থাপন করা সম্ভব হলে লেকগুলোতে সরাসরি অপরিশোধিত বর্জ্য প্রবেশ বন্ধ করা যাবে, যা জলদূষণ নিয়ন্ত্রণে একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই সমাধান দেবে। এছাড়াও, নিয়মিতভাবে লেক এবং সেগুলোর সাথে সংযুক্ত খালগুলো পরিষ্কার করা, জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ করা এবং স্বাভাবিক জলপ্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে বিশদ আলোচনা ও মতবিনিময় করা হয়। লেকগুলোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত স্বাস্থ্য বজায় রাখতে এই নিয়মিত পরিচর্যা অপরিহার্য।
উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু আরও জানান, বৈঠকে কড়াইল বস্তি থেকে সরাসরি লেকগুলোতে বর্জ্য প্রবেশ রোধে কী ধরনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে, সে বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বস্তি এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি জটিল সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, যা সমাধানের জন্য একটি মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। এই সমস্যা সমাধানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকর কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে লেকগুলোর পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে এবং বস্তি এলাকার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহমেদ সোহেল মনজুর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সচিব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এই উপস্থিতি লেক দূষণমুক্তকরণ প্রকল্পের প্রতি সরকারের উচ্চ অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দেয়।
প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর নির্দেশনা এবং গৃহীত পরিকল্পনাগুলো রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ লেকগুলোর পরিবেশ পুনরুদ্ধারে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি কেবল লেকগুলোর জলজ পরিবেশের উন্নতি ঘটাবে না, বরং নগরীর সার্বিক পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একটি পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা গড়ার লক্ষ্যে সরকারের এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয়।