শুক্রবার, 10 জুলাই 2026
⚠ ব্রেকিং
প্রশাসন 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

পাবনায় বরখাস্ত শিক্ষককে দায়িত্বে ফিরিয়ে দেওয়ায় শিক্ষা কর্মকর্তাকে শোকজ: তোলপাড় শিক্ষামহলে

পাবনার দড়িভাউডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয়ে ফেরার সুযোগ এবং হাজিরা খাতায় সই করার অনুমতি দেওয়ায় সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাফিয়া আখতার অপুকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের এই সিদ্ধান্তে শিক্ষামহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

শেয়ার করুন:
পাবনায় বরখাস্ত শিক্ষককে দায়িত্বে ফিরিয়ে দেওয়ায় শিক্ষা কর্মকর্তাকে শোকজ: তোলপাড় শিক্ষামহলে

পাবনা, ৬ জুলাই ২০২৬: সাময়িক বরখাস্ত হওয়া একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয়ে ফেরার অনুমতি এবং হাজিরা খাতায় সই করার সুযোগ দেওয়ায় পাবনা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাফিয়া আখতার অপুকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) জারি করা হয়েছে। এই ঘটনা জেলাজুড়ে শিক্ষামহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় থেকে গত ৫ জুলাই, রবিবার, এই নোটিশটি জারি করা হয়, যেখানে উল্লিখিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর প্রশাসনিক অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত দড়িভাউডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক) জহুরুল ইসলাম একটি ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যান। এর ফলস্বরূপ, গত ৯ জুন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সরকারি বিধি অনুযায়ী, সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কোনো শিক্ষক কর্মস্থলে যোগদান করতে পারেন না বা দাপ্তরিক কোনো কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন না যতক্ষণ না তার বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করা হয় অথবা তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। এই ধরনের পরিস্থিতিতে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্বে ফেরা সম্পূর্ণভাবে আইন ও প্রশাসনিক প্রথার পরিপন্থী।

অভিযোগ উঠেছে যে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাফিয়া আখতার অপু, তার এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই, বরখাস্তকৃত শিক্ষক জহুরুল ইসলামকে বিদ্যালয়ে তার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করার সুযোগ দিয়েছেন। এমনকি তাকে হাজিরা খাতায় সই করারও অনুমতি দেওয়া হয়, যা সাময়িক বরখাস্তের আদেশের সরাসরি লঙ্ঘন। এই পদক্ষেপটি প্রশাসনের উচ্চ মহলে নজরে আসার পর নড়েচড়ে বসে শিক্ষা বিভাগ। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের পত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ধরনের অনুমতি প্রদানের ক্ষমতা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার নেই এবং এটি একটি গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল কবীর এই বিষয়ে তার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “ওই শিক্ষা কর্মকর্তা (সাফিয়া আখতার অপু) এ ধরনের অনুমতি দিতে পারেন না। এটি সম্পূর্ণভাবে বিধি বহির্ভূত কাজ।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা তাকে কারণ দর্শাতে বলেছি। তার ব্যাখ্যা পাওয়ার পর আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।” কবীর সাহেব জোর দিয়ে বলেন যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। এই ধরনের ঘটনা শিক্ষা খাতের সুনাম ক্ষুণ্ন করে এবং শিক্ষার্থীদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে, কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাফিয়া আখতার অপুর প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। তিনি বলেন, “স্যার (জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা) আমাকে এমনি এমনিই অনেক শোকজ করেন। এই শোকজটি অন্যায়ভাবে করা হয়েছে।” এরপর তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে আপনি আমাকে কেন কল দিয়েছেন?” এই কথা বলেই তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। তার এই প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায় যে তিনি এই নোটিশকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে দেখছেন এবং অভিযোগের সত্যতা মানতে নারাজ। তার এই ধরনের মন্তব্য প্রশাসনিক তদন্তের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করতে পারে।

এই পুরো ঘটনাটি প্রথম জনসমক্ষে আসে গত ৩০ জুন, যখন একটি জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল 'জাগো নিউজ'-এ 'বরখাস্ত হয়েও দায়িত্বে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক' শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেই সংবাদে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয় কিভাবে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ও সাময়িক বরখাস্ত হওয়া শিক্ষক অনৈতিকভাবে তার পদে বহাল আছেন। গণমাধ্যমে এই খবর প্রকাশের পরই জেলা শিক্ষা প্রশাসনের টনক নড়ে এবং বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গণমাধ্যমের এই ভূমিকা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

এই ঘটনাটি কেবল একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং এটি শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহিতার উপর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। যখন একজন শিক্ষক ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হয়ে সাময়িক বরখাস্ত হন, তখন তাকে পুনরায় কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিক পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। এমন পরিস্থিতিতে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার এই ধরনের সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন সরকারি বিধি লঙ্ঘনের নামান্তর, তেমনি অন্যদিকে তা সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের আস্থার জায়গা নষ্ট করে। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে সাফিয়া আখতার অপুকে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য পাঁচ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তার ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই ঘটনা শিক্ষা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে আরও কঠোর নজরদারি ও নিয়মাবলী প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ