বৃহস্পতিবার, 9 জুলাই 2026
⚠ ব্রেকিং
প্রশাসন 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

আইনি লড়াইয়ে জয়: ২৭তম বিসিএসের আরও ৭৭ বঞ্চিত প্রার্থীকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ

দীর্ঘ আইনি জটিলতা ও প্রায় দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২৭তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আরও ৭৭ জন প্রার্থীকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাদের দ্রুত যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেখানে জ্যেষ্ঠতা অক্ষুণ্ণ থাকলেও কোনো বকেয়া আর্থিক সুবিধা থাকছে না।

শেয়ার করুন:
আইনি লড়াইয়ে জয়: ২৭তম বিসিএসের আরও ৭৭ বঞ্চিত প্রার্থীকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২৭তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আরও ৭৭ জন বঞ্চিত প্রার্থীকে অবশেষে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানানো হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) সুপারিশের ভিত্তিতে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দশক ধরে চলা একটি জটিল আইনি লড়াইয়ের ফলশ্রুতিতে আরও একটি ধাপ সম্পন্ন হলো, যা হাজারো চাকরিপ্রার্থীর জন্য আশার আলো নিয়ে এসেছিল।

এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নতুন নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক পদক্ষেপের অংশ। এর আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর, ২৭তম বিসিএসের প্রথম মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও পরবর্তীতে নিয়োগবঞ্চিত ৬৭৩ জন প্রার্থীকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এরপর চলতি বছরের ১৩ মে আরও ৯৬ জন প্রার্থীকে একই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে, এই দফায় ৭৭ জনসহ মোট ৮৪৬ জন প্রার্থীকে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার পর সরকারি চাকরিতে পুনর্বহাল করা হলো, যা আপিল বিভাগের রায় বাস্তবায়নেরই অংশ।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ৭৭ জন প্রার্থীকে আগামী ১৪ জুলাইয়ের মধ্যে তাদের সংশ্লিষ্ট ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগের নির্ধারিত কার্যালয়ে যোগদান করতে বলা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে যদি পরবর্তী কোনো নির্দেশনা না আসে, তবে নির্ধারিত তারিখেই তাদের যোগদান সম্পন্ন করতে হবে। যদি কোনো প্রার্থী নির্ধারিত তারিখে যোগদান করতে ব্যর্থ হন, তবে ধরে নেওয়া হবে যে তিনি চাকরিতে যোগদানে ইচ্ছুক নন এবং তার নিয়োগপত্র বাতিল বলে গণ্য হবে। এই কঠোর নির্দেশনা নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যেই জারি করা হয়েছে।

এই নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিয়োগপ্রাপ্তদের জ্যেষ্ঠতা অক্ষুণ্ণ রাখা। প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে যে, এই ব্যাচের প্রথম যে তারিখে নিয়োগ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল, সেই তারিখ থেকে ভূতাপেক্ষিকভাবে নিয়োগ আদেশ কার্যকর হবে। এর অর্থ হলো, তাদের ব্যাচের প্রথম নিয়োগ প্রজ্ঞাপনের যোগদানের তারিখ থেকে তাদের ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা বজায় থাকবে। তবে, এই ভূতাপেক্ষিক জ্যেষ্ঠতার কারণে তারা কোনো বকেয়া আর্থিক সুবিধাদি পাবেন না। অর্থাৎ, তারা শুধুমাত্র তাদের পদমর্যাদার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী তারিখ থেকে গণনা করার সুযোগ পাবেন, কিন্তু আর্থিক সুবিধা কেবল যোগদানের তারিখ থেকেই কার্যকর হবে।

২৭তম বিসিএস ঘিরে আইনি জটিলতার সূত্রপাত হয় ২০০৭ সালের ২১ জানুয়ারি। সেসময় তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে ২৭তম বিসিএসের প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়, যেখানে ৩,৫৬৭ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু একই বছরের ৩০ জুন, জরুরি অবস্থার সময় তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ওই ফল বাতিল করে দেয়। সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উত্তীর্ণ প্রার্থীরা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। তবে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই হাইকোর্ট সরকারের সিদ্ধান্তকে বৈধ বলে রায় দেন, যার বিরুদ্ধে রিটকারীরা আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন।

এদিকে, প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ফল বাতিলের পর ২০০৭ সালের ২৯ জুলাই ২৭তম বিসিএসের দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০০৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ফল অনুযায়ী দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষায় ৩,২২৯ জন উত্তীর্ণ হন এবং তাদের চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর ফলে প্রথম মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীরা আবারও হাইকোর্টে তিনটি পৃথক রিট দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানির পর, ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর হাইকোর্টের অপর একটি বেঞ্চ দ্বিতীয়বার মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন, যা নিয়োগবঞ্চিতদের জন্য একটি বড় বিজয় ছিল।

হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে তিনটি লিভ টু আপিল আবেদন দাখিল করে। আপিল বিভাগ কিছু পর্যবেক্ষণসহ ওই আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করেন। এরপর, বাতিল হওয়া ২৭তম বিসিএস পরীক্ষার প্রথম মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা আপিল বিভাগের রায় রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) চেয়ে আবেদন করেন। গত বছরের ৭ নভেম্বর আপিল বিভাগ রিভিউ আবেদন মঞ্জুর করে তা শুনানির জন্য গ্রহণের আদেশ দেন, যা নিয়োগবঞ্চিত রিভিউ আবেদনকারীদের আইনি লড়াইয়ের পথকে আরও উন্মুক্ত করে দেয়। অবশেষে, গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি ওই আবেদনের শুনানি শেষে ২০ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায় দেন, যেখানে ২৭তম বিসিএসে নিয়োগবঞ্চিত এক হাজার ১৩৭ জনের চাকরি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গত বছরের ১১ আগস্ট বিসিএসে বঞ্চিত এক হাজার ১৩৭ জনকে নিয়োগ দিতে হাইকোর্টের রায় দ্রুত কার্যকরের নির্দেশ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। এই রায়ে সরকারকে অবিলম্বে নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য বলা হয়। সেই রায়ের আলোকেই ধাপে ধাপে নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীদের সরকারি চাকরিতে পুনর্বহাল করা হচ্ছে। এই ৭৭ জনের নিয়োগের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘদিনের আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিসমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ