দেশের কৃষি খাতকে আধুনিকায়ন ও কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে 'কৃষক কার্ড' চালুর ঘোষণা দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ। শনিবার (৪ জুলাই, ২০২৬) চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি জানান, এই কার্ডের মাধ্যমে দেশের কৃষি ব্যবস্থাপনা একটি সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক কাঠামোর আওতায় আসবে। মন্ত্রীর এই পদক্ষেপকে কৃষি খাতের দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
কৃষিমন্ত্রী বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন, নতুন এই ব্যবস্থার ফলে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকবে যে কোন অঞ্চলে কী পরিমাণ ফসল উৎপাদিত হচ্ছে এবং বাজারে তার চাহিদা কেমন। এই তথ্যভিত্তিক উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে উৎপাদন পরিকল্পনা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় সাধন করা সম্ভব হবে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে আসবে এবং কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক ও ন্যায্যমূল্য পেতে সক্ষম হবেন, যা তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
শুধু শস্য উৎপাদনকারী কৃষকরাই নন, কৃষক কার্ডের আওতায় লবণ, সুপারি, নারিকেল, পান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত হবেন। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি কৃষি খাতের সকল অংশীদারকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসবে। ভবিষ্যতে সরকারি ভর্তুকি, প্রণোদনা এবং অন্যান্য সহায়তা সরাসরি প্রকৃত কৃষকদের কাছে এই কার্ডের মাধ্যমেই পৌঁছে দেওয়া হবে, যা সহায়তা বিতরণে দীর্ঘদিনের অসঙ্গতি ও অনিয়ম দূর করে স্বচ্ছতা আনবে এবং যোগ্য ব্যক্তিরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন না।
কৃষকদের লোকসান কমানোর লক্ষ্যে সরকার আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইউনিয়ন পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎচালিত মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ। এই স্টোরেজগুলো কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণে সহায়তা করবে, যাতে তারা ফসলের দাম কম থাকলে তা সংরক্ষণ করে সুবিধাজনক সময়ে বিক্রি করতে পারেন। এর পাশাপাশি সরকার ইতোমধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে, যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এক বিশাল স্বস্তি এনেছে এবং তাদের নতুন করে চাষাবাদে উৎসাহিত করবে।
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পরও মাঝে মাঝে কিছু কৃষিপণ্য আমদানির প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, সীমিত আবাদযোগ্য জমি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কিছু ফসলের ঘাটতি তৈরি হয়। এই সমস্যা মোকাবিলায় সরকার আগাম পরিপক্ব ধানের জাত উদ্ভাবন এবং জলাবদ্ধ এলাকায় উপযোগী কৃষিযন্ত্র আবিষ্কারে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করেছে। খাল পুনঃখনন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি ভর্তুকি ও বিভিন্ন প্রণোদনা কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে সরকার।
চট্টগ্রাম ফিশারি ঘাটের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নিয়ে সম্প্রতি ওঠা অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী তার দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হবে এবং তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে সরকারের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, সরকার ঝাটকা সংরক্ষণ ও প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে জেলেদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে। পাশাপাশি জেলেদের দাদনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ইলিশ রপ্তানির সক্ষমতা বাড়াতেও সরকার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং ইলিশের ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবে।
কৃষি ও মৎস্য খাতের পাশাপাশি সার্বিক গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নেও সরকার সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার, চর অপসারণ এবং উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। এই লক্ষ্যে কোস্টগার্ডের জনবল বৃদ্ধির পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এই সভায় কৃষি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং মন্ত্রীর বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়নে তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।