অস্ট্রেলিয়ার সিডনির মনোরম রাস্তায় এক বিরল ও মন মুগ্ধ করা দৃশ্যের সাক্ষী হলেন দুই প্রজন্মের দর্শক। নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা শাবনূর চালকের আসনে, তাঁর পাশে সহযাত্রী হিসেবে বসে খালি গলায় গান শোনাচ্ছেন দেশবরেণ্য সংগীতশিল্পী রবি চৌধুরী। গাড়ির পেছনের আসনে ছিল শাবনূরের একমাত্র ছেলে আইজান নেহান। এক সময়ের রূপালি পর্দার আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই দুই তারকার এমন অকপট ও আনন্দময় মুহূর্ত যেন ফিরিয়ে এনেছিল সোনালি দিনের স্মৃতি। গাড়ি চলছে সিডনির পথে, গান চলছে রবি চৌধুরীর কণ্ঠে, আর জমে উঠেছে দীর্ঘদিনের পুরোনো আড্ডা। এই দৃশ্য প্রমাণ করে, তারকাখ্যাতির বাইরেও তাঁদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব কতটা গভীর ও অটুট রয়েছে এতগুলো বছর পরও।
সম্প্রতি একটি স্টেজ শোতে অংশ নিতে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন সংগীতশিল্পী রবি চৌধুরী। তাঁর এই সফরের খবর আগেই পেয়েছিলেন সিডনি প্রবাসী শাবনূর। প্রিয় বন্ধুর আগমন উপলক্ষে তিনি আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন একসঙ্গে সময় কাটানোর। সেই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নেয় একটি ছুটির দিনে, যখন শাবনূর রবি চৌধুরীকে সিডনির বিভিন্ন নয়নাভিরাম স্থান ঘুরে দেখানোর দায়িত্ব নেন। আর গাড়িতে বসে বন্ধুকে গান শুনিয়ে সফরকে আরও আনন্দময় করে তোলার দায়িত্ব নেন রবি চৌধুরী। তাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত মিলন যেন ভক্তদের মনেও এক অন্যরকম দোলা দিয়ে যায়, যেখানে তারকাদের ঝলমলে জীবনের বাইরেও এক সাধারণ বন্ধুত্বের উষ্ণতা ফুটে ওঠে।
গাড়ি যখন সিডনির পথ ধরে ছুটে চলছিল, তখন শাবনূরের অনুরোধে রবি চৌধুরী গেয়ে শোনান তাঁর অত্যন্ত পছন্দের গান ‘যেভাবেই তুমি সকাল দেখো’। এরপর গাড়ি থেকে নেমে বিশেষ আবদারে তিনি গেয়ে ওঠেন ১৯৯৭ সালের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘ভালোবাসি তোমাকে’র কালজয়ী গান ‘অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন’। একসময় যে গানটি রিয়াজ ও শাবনূরের ঠোঁটে পর্দায় এসে অগণিত দর্শকের মন জয় করেছিল, এত বছর পর একই গানের শিল্পী রবি চৌধুরীর কণ্ঠে তা আবার শুনে যেন পুরোনো দিনের সেই মধুর স্মৃতিগুলো ফিরে আসে। শাবনূর নিজেও এই গানে মেতে ওঠেন, যা তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে স্পষ্ট হয়। এই গানটি মূল শিল্পী ছিলেন খালিদ হাসান মিলু ও কনকচাঁপা, এবং এর গীতিকার ও সুরকার ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।
এই আনন্দময় ঘোরাঘুরির ফাঁকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন উচ্ছ্বসিত শাবনূর। তিনি বলেন, “অসাধারণ সময় কাটছে। অনেক দিন পর আমাদের দেখা। রবি ভাইয়ের সঙ্গে দারুণ মজা হচ্ছে। আমরা সিডনির বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছি, আমি গাড়ি চালাচ্ছি আর রবি ভাইয়ের কণ্ঠে গান – সব মিলিয়ে দারুণ, দারুণ!” তাঁর কথায় ছিল এক অনাবিল আনন্দ আর প্রিয় বন্ধুর সান্নিধ্যের উষ্ণতা। শাবনূর স্পষ্টতই এই মুহূর্তগুলোকে তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন, যা তাঁর দীর্ঘদিনের প্রবাস জীবনে এক নতুন আনন্দের বার্তা এনে দিয়েছে।
পরবর্তীতে শাবনূরের ফোন থেকেই সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন রবি চৌধুরী। তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে মানুষের নানা কৌতূহলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মানুষজন তো কত কী ভাবে। অথচ আমরা ক্যারিয়ারের শুরুর সময় থেকেই বন্ধু। শাবনূর একজন অসাধারণ অভিনেত্রী, তাঁর সিনেমা যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন। আর বন্ধুত্বের কারণে আমি দেখেছি, কী অসাধারণ একজন মানুষ শাবনূর।” রবি চৌধুরীর কথায় ছিল শাবনূরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অকুণ্ঠ প্রশংসা, যা তাঁদের বন্ধুত্বের ভিত্তি কতটা মজবুত তা প্রমাণ করে। তিনি শাবনূরের অভিনয় প্রতিভার পাশাপাশি তাঁর মানবিক গুণাবলীরও ভূয়সী প্রশংসা করেন।
বন্ধুর এমন প্রশংসায় চুপ থাকেননি শাবনূরও। তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “রবি ভাই ভালো মানুষ না হলে তো আমাদের এত বছরের বন্ধুত্ব টিকত না। বন্ধুত্বের এই সম্পর্কটা টিকে থাকুক সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।” এই পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসাই তাঁদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের মূল ভিত্তি। উল্লেখ্য, শাবনূর ও রবি চৌধুরীর জন্মদিন একই দিনে, ১৭ ডিসেম্বর। এর আগেও শাবনূর যখন ঢাকায় এসেছিলেন, তখন রবি চৌধুরীর বাসায় একসঙ্গে জন্মদিন উদ্যাপন করেছিলেন তাঁরা। সময়ের সাথে সাথে দুজনের জীবনের গতিপথ বদলেছে, বদলে গেছে ঠিকানাও; কিন্তু বন্ধুত্ব রয়ে গেছে আগের মতোই অটুট ও নিবিড়।
সিডনিতে কাটানো এই সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে শাবনূর লিখেছেন, “সিডনিতে প্রিয় সংগীতশিল্পী রবি চৌধুরীকে কাছে পেয়ে ফিরে গেলাম ‘ভালোবাসি তোমাকে’ চলচ্চিত্রের সেই মধুর স্মৃতিতে। ছবিটির জনপ্রিয় গান ‘অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন’ যার মূল শিল্পী ছিলেন খালিদ হাসান মিলু ও কনকচাঁপা। প্রিয় রবি চৌধুরীর কণ্ঠে আজ সেই গানটির দুই লাইন শুনে নস্টালজিয়ায় ডুবে গেলাম। বাংলা আধুনিক গানের জনপ্রিয় এই শিল্পীর সঙ্গে সিডনিতে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলো স্মরণীয় হয়ে থাকবে।” এই পোস্টটি তাঁদের অনুরাগীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং দুই তারকার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বার্তা পৌঁছে দেয়। চলচ্চিত্র ‘ভালোবাসি তোমাকে’র পরিচালক ছিলেন মহম্মদ হান্নান।