টেলিভিশন বিনোদনের জগতে 'ব্রেকিং ব্যাড' যেন এক কিংবদন্তি নাম। যারা এটি দেখেছেন এবং যারা দেখেননি, তাদের মধ্যে এটি প্রায়শই একটি বিভাজন রেখা তৈরি করে। প্রচার শেষ হওয়ার এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই সিরিজটির প্রভাব ও আলোচনা এতটুকু কমেনি, বরং সময়ের সাথে সাথে এর আবেদন যেন আরও গভীর হয়েছে। সম্প্রতি যখন নিউইয়র্ক টাইমস একুশ শতকের সেরা ১০০ টেলিভিশন সিরিজের তালিকা প্রকাশের ঘোষণা দেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল—কোন সিরিজটি শীর্ষস্থান দখল করবে? সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রভাবশালী এই মার্কিন সংবাদপত্রটি তাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে এবং প্রত্যাশিতভাবেই ভিন্স গিলিগানের অনবদ্য সৃষ্টি 'ব্রেকিং ব্যাড' এই তালিকার এক নম্বরে জায়গা করে নিয়েছে।
গত পঁচিশ বছরে টেলিভিশনের পর্দা যেভাবে বদলেছে, বিনোদনের অন্য কোনো মাধ্যম সম্ভবত এত দ্রুত পরিবর্তিত হয়নি। একসময় নির্দিষ্ট সময়ে টিভির সামনে বসে পছন্দের অনুষ্ঠান দেখা ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। এরপর এলো কেবল টেলিভিশনের ব্যাপক বিস্তার, যা দর্শকের কাছে এনে দিল আরও বেশি বৈচিত্র্য। বর্তমানে অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর কল্যাণে দর্শকের হাতের মুঠোয় একই সাথে অসংখ্য দেশের, অসংখ্য ভাষার সিরিজ। বিনোদনের এই দীর্ঘ ও দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়টাকেই ফিরে দেখেছে নিউইয়র্ক টাইমস, যার ফলস্বরূপ তৈরি হয়েছে একুশ শতকের সেরা ১০০ টেলিভিশন সিরিজের এই বিশদ তালিকা। এই ঐতিহাসিক তালিকায় শীর্ষস্থান অর্জন করে 'ব্রেকিং ব্যাড' তার চিরন্তন আবেদন আরও একবার প্রমাণ করেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এই আয়োজনটি ছিল অত্যন্ত ব্যাপক পরিসরের এবং এর পেছনে ছিল সুচিন্তিত পদ্ধতি। পত্রিকাটি তাদের তথ্য ও বিশ্লেষণভিত্তিক বিভাগ 'দ্য আপশট'-এর সাথে যৌথভাবে কাজ করেছে। টেলিভিশন অঙ্গনের পাঁচ শতাধিক পেশাজীবীর কাছে ব্যালট পাঠানো হয়েছিল, যেখানে তাঁদেরকে একুশ শতকের সেরা সর্বোচ্চ ১০টি সিরিজ বেছে নিতে বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত করা হয় যে, তালিকাটি তৈরি হয়েছে ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞ এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মতামতের ভিত্তিতে, যা এর বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা বহুলাংশে বাড়িয়ে তোলে।
সিরিজ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ছিল সুস্পষ্ট নিয়মাবলী। যোগ্যতার মাপকাঠি অনুযায়ী, সিরিজটির প্রথম পর্ব অবশ্যই ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি বা তার পরে প্রচারিত হতে হবে। সিরিজটি যে দেশের বা যে ভাষারই হোক না কেন, তা বিবেচনার জন্য কোনো বাধা ছিল না। ড্রামা, কমেডি, তথ্যচিত্র, রিয়েলিটি শো, টক শো, গেম শো—এমনকি ইউটিউব সিরিজও এই বিবেচনার আওতাধীন ছিল, তবে একমাত্র শর্ত ছিল সিরিজটিতে একাধিক পর্ব থাকতে হবে। শুধু ব্যালটে প্রাপ্ত ভোট গুনেই চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হয়নি; ভোট দেওয়ার পর অংশগ্রহণকারীদের দুটি করে এলোমেলোভাবে নির্বাচিত সিরিজের মধ্যে কোনটিকে তাঁরা বেশি পছন্দ করেন, সেটিও বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এই দুই ধরনের তথ্যের সংমিশ্রণে ৫১৬ জন ভোটারের পছন্দ থেকে তৈরি হয়েছে চূড়ান্ত ফলাফল, যা তালিকাটিকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
'ব্রেকিং ব্যাড'-এর গল্প শুরু হয় একজন সাধারণ রসায়ন শিক্ষক ওয়াল্টার হোয়াইটের জীবন দিয়ে। সংসারী, কিছুটা হতাশ এবং ক্যান্সারে আক্রান্ত ওয়াল্টার তার পরিবারের আর্থিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে মাদক তৈরির অন্ধকার জগতে পা রাখেন। কিন্তু সেই একটি সিদ্ধান্ত যে তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, শুরুতে ওয়াল্টার নিজেও তা জানতেন না। ২০০৮ সালে শুরু হয়ে ২০১৩ সালে শেষ হওয়া এই সিরিজটির পাঁচটি মৌসুম জুড়ে দর্শক সাক্ষী হন একজন সাধারণ মানুষের ধীরে ধীরে অপরাধজগতের এক ক্ষমতাবান চরিত্রে রূপান্তরিত হওয়ার অবিশ্বাস্য যাত্রার। ব্রায়ান ক্র্যানস্টন ওয়াল্টারের চরিত্রে এবং তার প্রাক্তন ছাত্র জেসি পিংকম্যানের চরিত্রে অ্যারন পল অভিনয় করে তাদের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন।
সিরিজের শুরুতে দর্শক ওয়াল্টারকে দেখেন একজন অসুস্থ, ভীত এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষক হিসেবে। তার নেওয়া প্রাথমিক সিদ্ধান্তগুলোকে বোঝা যায়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তার প্রতি সহানুভূতিও তৈরি হয়। কিন্তু গল্প যত এগোতে থাকে, সেই সহানুভূতির জায়গা দখল করে নেয় এক গভীর অস্বস্তি। কারণ ওয়াল্টার কেবল পরিস্থিতির শিকার হয়ে থাকেন না, ধীরে ধীরে তিনিই পরিস্থিতি তৈরি করতে শুরু করেন। ওয়াল্টার হোয়াইটের সেই অন্ধকার রূপের নাম হয়ে ওঠে 'হাইজেনবার্গ'। পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জনের অজুহাতে মাদক ব্যবসায় নামা এই মানুষটি ধীরে ধীরে অর্থ, ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের নেশায় এমন এক জায়গায় পৌঁছান, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তার সবচেয়ে বড় সংঘাত শেষ পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে নয়, বরং নিজের ভেতরের সত্তার সঙ্গেই চলতে থাকে।
'ব্রেকিং ব্যাড'-এর আরেকটি বড় শক্তি ছিল এর অসাধারণ নির্মাণশৈলী এবং গল্প বলার ধরণ। সিরিজটি কেবল বড় ঘটনা বা চমক ব্যবহার করে দর্শককে ধরে রাখেনি; বরং দর্শককে অপেক্ষা করিয়েছে, সন্দেহে রেখেছে এবং তারপর ধীরে ধীরে অনিবার্য 'বিপদের দিকে' ঠেলে দিয়েছে। এর প্রতিটি ফ্রেম, প্রতিটি সংলাপ ছিল অর্থবহ ও সুচিন্তিত। সিরিজটি শেষ হওয়ার পরও এর প্রভাব এতটুকু কমেনি, বরং এর উত্তরাধিকার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সিরিজটির অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র সল গুডম্যানকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে 'বেটার কল সল', যা নিজেও নিউইয়র্ক টাইমসের এই তালিকায় ২ নম্বরে জায়গা করে নিয়েছে। এটিই প্রমাণ করে 'ব্রেকিং ব্যাড' কেবল একটি সিরিজ ছিল না, এটি ছিল এক টেলিভিশন বিপ্লবের সূচনাকারী।