শুক্রবার, 25 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

ক্ষমার পরাকাষ্ঠা: মহানবী (সা.) যেভাবে শত্রুকেও নিঃশর্ত মুক্তি দিয়েছিলেন

প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে উঠে ক্ষমা ও কল্যাণ কামনার যে অনন্য দৃষ্টান্ত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) স্থাপন করে গেছেন, তা মানবজাতির ইতিহাসে বিরল। তাঁর জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি ছিল কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী নিঃশর্ত ক্ষমা। এমনকি চরম শত্রুদের প্রতিও তাঁর ক্ষমাশীলতা ছিল অতুলনীয়।

শেয়ার করুন:
ক্ষমার পরাকাষ্ঠা: মহানবী (সা.) যেভাবে শত্রুকেও নিঃশর্ত মুক্তি দিয়েছিলেন

মানব চরিত্রের সর্বোচ্চ নৈতিক গুণগুলোর মধ্যে ক্ষমা অন্যতম, যা মানুষের অন্তরের সংকীর্ণতা ও প্রতিশোধপরায়ণতার কদর্য দিকগুলো দূর করে এক গভীর প্রশান্তি এনে দেয়। প্রতিশোধ গ্রহণের প্রবণতা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলেও, তাকে জয় করে ক্ষমা করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত মহত্ত্ব ও উদারতা। এই মহত্ত্বের এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.), যিনি তাঁর শত্রুদেরও নিঃশর্তভাবে ক্ষমা করে তাদের জন্য কল্যাণ কামনা করেছিলেন। তাঁর জীবন শুধু ক্ষমার এক বিশেষ অধ্যায় ছিল না, বরং পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা অনুসরণে তাঁর সমগ্র জীবনদর্শনের মূল ভিত্তিই ছিল এই ক্ষমা ও সহনশীলতা।

আল্লাহ তাআলা স্বয়ং মহানবী (সা.)-কে ক্ষমার নীতি অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘আপনি ক্ষমার নীতি অবলম্বন করুন, সৎকাজের আদেশ করুন এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৯৯)। অন্যত্র, নবীজির হৃদয়গ্রাহী কোমলতা ও মার্জিত আচরণের প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলেন; যদি আপনি কঠোর ও পাষাণ হৃদয় হতেন, তবে তারা আপনার নিকট থেকে সরে যেত। অতএব আপনি তাদের মার্জনা করুন এবং তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করুন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)। এই আসমানি নির্দেশের প্রতিটি অক্ষর যেন নবীজির জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে পূর্ণ প্রতিফলিত হয়েছিল। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)-কে যখন রাসুল (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, ‘পবিত্র কোরআনই ছিল তাঁর চরিত্র।’

নবুয়তের দশম বর্ষে মক্কায় কোরাইশদের অকথ্য নির্যাতন যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন মহানবী (সা.) ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তায়েফ শহরে গমন করেন। কিন্তু তায়েফের সরদাররা তাঁর পবিত্র বার্তা কেবল প্রত্যাখ্যানই করেনি, বরং শহরের বখাটে ও উচ্ছৃঙ্খল ছেলেদের তাঁর পেছনে লেলিয়ে দেয়। তারা তাঁকে নির্লজ্জভাবে গালমন্দ করে এবং পাথর ছুড়ে রক্তাক্ত করে তোলে। এই বর্বর হামলায় তাঁর জুতা জোড়া রক্তে ভিজে তাঁর পা দুটির সঙ্গে লেপ্টে গিয়েছিল, যা তাঁর শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার গভীরতা প্রকাশ করে। এমন চরম নির্যাতন ও অপমানের মুখেও তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল মানব ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

এই হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিতে, জিবরাইল (আ.) পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতাকে নিয়ে রাসুল (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হন। জিবরাইল (আ.) বলেন, আল্লাহ আপনার প্রতি আপনার সম্প্রদায়ের উক্তি এবং আপনার বিরুদ্ধে তাদের উত্তরও শুনেছেন, তিনি আপনার নিকট পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন, যেন আপনার সম্প্রদায়ের ব্যাপারে যা ইচ্ছা তাকে আদেশ করেন। তখন পাহাড়ের ফেরেশতাও বলেন, ‘হে মুহাম্মাদ (সা.), আপনার প্রতি আপনার সম্প্রদায়ের লোকজনের উক্তি আল্লাহ তাআলা শুনেছেন, আর আমি পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা। আপনার রব আপনার কাছে আমাকে এ জন্য পাঠিয়েছেন যেন আপনি আপনার চাহিদামাফিক আমাকে নির্দেশ দেন। আপনি বললে আমি এই দুই পাহাড় তাদের ওপর চাপা দিয়ে দেব।’ কিন্তু তিনি চরমতম নিপীড়কদের জন্যও কোনো প্রতিশোধ বা ধ্বংস কামনা করেননি। তিনি উত্তর দিলেন, ‘না, বরং আমি আশা করছি, আল্লাহ তাআলা হয়তো এদের বংশধর থেকেই এমন মানুষ জন্ম দেবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৩১)। নিজের রক্তে ভেজা শরীরে শত্রু ধ্বংসের এমন সুযোগ পেয়েও ক্ষমা ও কল্যাণের এই আকুতি মানবজাতির ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

মহানবী (সা.)-এর ক্ষমাশীলতার সবচেয়ে উজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের দিন। দীর্ঘ দুই দশক ধরে যে মক্কাবাসী তাঁকে ও তাঁর সাহাবিদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছিল, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করেছিল, মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং একের পর এক যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল, সেই বিজিত শত্রুরাই সেদিন নবীজি (সা.)-এর সামনে সম্পূর্ণ অসহায় ও অবনতমস্তকে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রায় দশ হাজার মুসলিম সেনাদল নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করে তিনি কোনো বিজয়ী সম্রাটের মতো প্রতিশোধ বা রক্তপাতের পথ বেছে নেননি, যা সে সময়ের যুদ্ধনীতিতে ছিল এক সাধারণ প্রথা।

কাবা প্রাঙ্গণে সমবেত ভীতসন্ত্রস্ত কোরাইশদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘হে কুরাইশ সম্প্রদায়, তোমরা আজ আমার কাছ থেকে কেমন ব্যবহার আশা করছ?’ তাদের দীর্ঘদিনের পাপ ও নির্যাতনের স্মৃতি সত্ত্বেও, তারা উত্তর দিল, ‘ভালো ব্যবহার আশা করছি। আপনি দয়ালু ভাই এবং দয়ালু ভাইয়ের সন্তান।’ তাদের এই উত্তরে যেন তাদের অসহায়ত্ব ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছিল। তাদের জানা ছিল, তাদের অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য যেকোনো কঠোর শাস্তিই স্বাভাবিক ছিল।

তখন মহানবী (সা.) সাধারণ ক্ষমার এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়ে বললেন, ‘যাও, তোমরা সবাই স্বাধীন ও মুক্ত।’ (তাবারি, তারিখে তাবারি, ৩/৬১, দারুল মাআরিফ, মিসর)। সেদিন তিনি আরও বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ। যে ব্যক্তি নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখবে, সে নিরাপদ। আর যে ব্যক্তি মসজিদে (কাবায়) প্রবেশ করবে, সে-ও নিরাপদ।’ (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪/৫৬২, দারু ইবনে কাসির, দামেস্ক, ২০১০)। যে মক্কায় তিনি একসময় নির্যাতিত ও নিগৃহীত হয়েছিলেন, সেই মক্কায় এক ফোঁটা রক্তও না ঝরিয়ে তিনি মক্কাবাসীকে ক্ষমা করে দিলেন। বিজয়ী রাষ্ট্রনায়কদের ইতিহাসে মক্কা বিজয়ের এই সাধারণ ক্ষমা এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা তাঁর অতুলনীয় দয়া ও করুণার প্রতীক।

মহানবী (সা.)-এর ক্ষমাশীলতা কেবল সমষ্টিগত শত্রুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি তাঁর প্রতি চরম শত্রুতা পোষণকারী এবং এমনকি তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত ব্যক্তিদেরও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তাঁর জীবন ছিল ক্ষমা, সহনশীলতা ও ভালোবাসার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, যা আজও মানবজাতিকে আলোর পথ দেখায়। তাঁর এই অতুলনীয় ক্ষমাশীলতা প্রমাণ করে যে, প্রকৃত শক্তি প্রতিশোধে নয়, বরং ক্ষমা ও ভালোবাসার মাধ্যমেই অর্জিত হয় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ