শুক্রবার, 18 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

স্বাভাবিক হচ্ছে গ্যাস সরবরাহ: শিল্প খাতে অগ্রাধিকার, বিদ্যুৎ পাচ্ছে এক-তৃতীয়াংশ

দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস সংকট কাটিয়ে দেশের শিল্প খাত ধীরে ধীরে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরছে। বর্ধিত সরবরাহের দুই-তৃতীয়াংশ যাচ্ছে শিল্পে, বাকি এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সত্ত্বেও সব শিল্প এলাকায় সমানভাবে গ্যাস পৌঁছাচ্ছে না।

শেয়ার করুন:
স্বাভাবিক হচ্ছে গ্যাস সরবরাহ: শিল্প খাতে অগ্রাধিকার, বিদ্যুৎ পাচ্ছে এক-তৃতীয়াংশ

দীর্ঘ দুই মাসেরও অধিক সময় ধরে চলা তীব্র গ্যাস সংকটের পর অবশেষে দেশের শিল্প খাতে স্বাভাবিকতা ফিরতে শুরু করেছে। উৎপাদনশীলতায় গতি আনতে গত তিন দিন ধরে শিল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্ধিত এই গ্যাস সরবরাহের একটি সুনির্দিষ্ট বন্টন নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, যেখানে মোট বাড়তি গ্যাসের দুই-তৃতীয়াংশ শিল্পকারখানায় এবং অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি শিল্প উৎপাদন সচল হতে শুরু করেছে এবং শ্রমিকদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে এসেছে, যেমনটি দেখা গেছে নরসিংদী শহরের চৌয়ালা এলাকার শিল্পাঞ্চলগুলোতে।

পেট্রোবাংলা সূত্র অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে গ্যাসের মোট সরবরাহ ছিল ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ১৬১ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) থেকে ৯৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ করা হয়েছে। এই বর্ধিত সরবরাহ ধীরে ধীরে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিকতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা শিল্প ও বিদ্যুৎ উভয় খাতের জন্যই ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

চলতি বছরের ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের ভাসমান টার্মিনালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ওই দুর্ঘটনার পর সরবরাহ নেমে এসেছিল মাত্র ২২০ কোটি ঘনফুটে। ১৫ আগস্ট টার্মিনালটি পুনরায় চালু হওয়ার পর সরবরাহ বেড়ে ২৩২ কোটি ঘনফুটে পৌঁছায়। বর্তমানে এটিকে আরও বাড়িয়ে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। গত মঙ্গলবার এলএনজি থেকে ১০১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হওয়ায় মোট সরবরাহ ২৬৩ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হয়, যা সংকট মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সোমবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার থেকে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা দেন। যদিও প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরপরই সোমবার রাত থেকেই প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি করা হয়। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরবরাহ বৃদ্ধির পর সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে শিল্প গ্রাহকদের। তবে বাগেরহাটের রামপাল এবং পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায়, চলমান লোডশেডিং কমাতে বিদ্যুৎ খাতেও গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সত্ত্বেও, বাড়তি গ্যাসের পুরোটা শিল্প খাতে সরবরাহ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন গ্যাস বিতরণ সংস্থা ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা। গত বুধবার রপ্তানি খাতের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্পের চারটি সংগঠন – বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএ এবং বিটিটিএলএমইএ – যৌথভাবে সঞ্চালন কোম্পানি জিটিসিএলকে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের বৃহত্তম বিতরণ সংস্থা তিতাস গ্যাসকে শিল্প খাতের চাহিদার চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, অথচ অন্যান্য বিতরণ সংস্থাগুলোকে প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়তি সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। তারা দ্রুত তিতাস এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

ঢাকা, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় গ্যাস সরবরাহ করে তিতাস গ্যাস। সংস্থাটির দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা যায়, গত ২১ জুলাইয়ের আগে তিতাসকে মোট ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ৩০ কোটি, সার কারখানায় ৭ কোটি এবং শিল্পসহ অন্যান্য খাতে ১১৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস যেত। গতকাল তিতাস পেয়েছে ১৩৭ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ২২ কোটি, সারে ৭ কোটি এবং শিল্পসহ অন্যান্য খাতে ১০৮ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়েছে। অর্থাৎ, শিল্প, আবাসিক ও সিএনজি খাতে তিতাস আগের মতো সরবরাহ করতে পারছে না, ফলে শিল্পের পাশাপাশি আবাসিকে রান্নার কাজেও গ্রাহকদের ভোগান্তি পুরোপুরি শেষ হয়নি।

পেট্রোবাংলা ও তিতাস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্প এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ আগের ধারায় ফিরে এসেছে। নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ এলাকায় সরবরাহ বেড়েছে, তবে কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ এখনো কম। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুরের চন্দ্রা, সফিপুর ও কোনাবাড়ী এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ তেমন বাড়ানো যায়নি। নরসিংদীর কিছু এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হলেও, অন্যান্য কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ অপরিবর্তিত রয়েছে। এই বৈষম্যমূলক সরবরাহ শিল্প মালিকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে, যা দ্রুত সমাধানের দাবি জানাচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল আকাশ বাণীকে বলেন, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেও এই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসছে। তিনি জানান, পরিকল্পনা অনুসারে শিল্প ও বিদ্যুৎ উভয় খাতেই সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে এবং আজ থেকে শিল্পে সরবরাহ আরও স্বাভাবিক হবে। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, পায়রা ও রামপাল এই দুটি কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়লে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ