যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার এক বাড়ির আঙিনায় সম্প্রতি আয়োজিত এক বনভোজন বাঙালি প্রবাসীদের মধ্যে নস্টালজিয়ার ঢেউ তুলেছে। আধুনিক জীবনযাত্রার ব্যস্ততার মাঝেও ইটের চুলায় ঐতিহ্যবাহী রান্না ও দেশীয় আমেজের আয়োজন শৈশবের স্মৃতিকে যেন নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। এই বিশেষ আয়োজনটি কেবল একটি সাধারণ বনভোজন ছিল না, বরং ছিল প্রবাসে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে শিকড়ের টান এবং ফেলে আসা দিনের প্রতিচ্ছবি।
আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের মতে, ছোটবেলায় শহরের কোলাহলে বেড়ে ওঠায় অনেকেরই গ্রামের মাটির চুলার রান্নার অভিজ্ঞতা ছিল না। ইলেকট্রিক চুলা আর ওভেনের যুগে মাটির চুলার রান্না এক গোপন শখ হয়েই রয়ে গিয়েছিল। শৈশবে আলু আর চাল নিয়ে মাঠে আগুন জ্বালানোর ব্যর্থ চেষ্টা এবং মাটির চুলা না পাওয়ার আক্ষেপ অনেককেই তাড়া করে বেড়াতো। স্কুল জীবনের পিকনিকে মাটির চুলায় রান্নার স্বপ্নিল পরিবেশ থাকলেও রান্নার আশপাশে ঘেঁষতে না পারার স্মৃতিও অনেকের মনে গেঁথে ছিল। এই বনভোজন সেই সব অপূর্ণ ইচ্ছাকে যেন পূরণ করার এক সুযোগ নিয়ে এসেছিল।
দীর্ঘদিন ধরে সুইডেন বা যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের চুলায় রান্নার অভ্যস্ততা এবং সহজলভ্যতার কারণে কাঠের চুলায় রান্না করার সুযোগ ছিল সীমিত। ব্যস্ত জীবনে ঝামেলা কমিয়ে সহজভাবে থাকার মানসিকতাই ছিল মুখ্য। তবে, মাস কয়েক আগে ক্যালিফোর্নিয়ার এক কাব্যিক বাড়ির পেছনের বাগানে বন্ধুদের আড্ডায় কাঠের চুলায় রান্না করে পিকনিক করার প্রস্তাব ওঠে। বাড়িটির পুরোনো ইংরেজি সিনেমার মতো সাজানো সামনের ও পেছনের বাগান, পাথরের চমৎকার সারি যেন এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। সৃষ্টিশীল ফারহাত আপু এই প্রস্তাবে সায় দিলে আয়োজনের পরিকল্পনা দানা বাঁধতে শুরু করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত এক শনিবারে সেই স্বপ্নিল বনভোজন অনুষ্ঠিত হয়। ইট বসিয়ে চুলা তৈরি এবং সমস্ত অগ্নি-নিরাপত্তা বিধি মেনে এই পিকনিকের আয়োজন করা হয়। প্রাথমিকভাবে এটি নিছকই একটি কল্পনা মনে হলেও, প্রস্তুতির ছবিগুলো দেখতে দেখতে অংশগ্রহণকারীদের মনে শৈশবের পিকনিকে যাওয়ার আবদার আর মায়ের কাছে শাড়ি চেয়ে কান্নাকাটির স্মৃতি ফিরে আসে। কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও দ্রুত কাজ শেষ করে শাড়ি পরে, খোঁপাজাতীয় কিছু মাথায় বেঁধে সবাই ছুটে আসেন সেই আয়োজনে।
অনুষ্ঠানের ভেন্যুতে পৌঁছানোর পর এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সবার নজর কাড়ে। বাড়ির পেছনের বাগানে ইটের চুলায় ডাল আর গরুর মাংস রান্না হচ্ছিল, পাশেই জিলাপি আর বেগুন ভাজা হচ্ছিল। একপাশে সাজানো ছিল আমভর্তা, জামভর্তা, চানাচুরমাখা আর পেঁয়াজুর মতো ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার। আলো আর ফুলে সজ্জিত এক ঝলমলে বিকেল ধীরে ধীরে সন্ধ্যায় রূপ নিচ্ছিল। এক প্যাঁচে শাড়ি আর মাথায় খোঁপা বাঁধা নারীদের দেখে মনে হচ্ছিল যেন পরীরা হেঁটে বেড়াচ্ছে।
বন্ধুদের সঙ্গে অনেক ছবি তোলা হয়, কেউ কেউ খুন্তি নিয়ে রান্নার ভান করে ক্যামেরাবন্দী হন। সন্ধ্যার পর দলীয় খেলাধুলা, মায়ের সঙ্গে মেয়েদের গানের তালে নাচ এবং 'লীলাবালি'র মতো গান পরিবেশনার মাধ্যমে সন্ধ্যাটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। চুলায় রান্না করা ঐতিহ্যবাহী খাবার খেয়ে সবাই তৃপ্ত হন। এই ব্যতিক্রমী আয়োজনটি প্রবাসে বাঙালি সংস্কৃতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যেখানে দেশীয় রীতিনীতি আর ঐতিহ্যকে সযত্নে লালন করা হয়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের একজন ফারহানা আহমেদ লিসা জানান, এই ধরনের আয়োজনগুলি মনের গভীরে এক বিশেষ স্থান করে নেয়। বিশেষত স্থপতি ফারহাত আপুর মতো মানুষেরা যখন এমন মন ছোঁয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, তখন তার প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী হয়। ব্যস্ত প্রবাস জীবনে এমন আনন্দের ছোঁয়া যেন ঘুরে ঘুরে সবার জীবনে আসে, সেই কামনা ছিল উপস্থিত সকলের। এই বনভোজন কেবল একটি সামাজিক মিলনমেলাই ছিল না, বরং ছিল প্রবাসে বাঙালি পরিচয়ের এক উদযাপন, যা আগামীর প্রজন্মের কাছেও ঐতিহ্যকে তুলে ধরার অনুপ্রেরণা যোগাবে।