শুক্রবার, 11 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

পেশাগত গাফিলতির অভিযোগ: কাঠগড়ায় ডা. প্যাটেল, রক্ষাকবচ বোন আইনজীবী ভিদিয়া

পেশাগত দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বিবেক প্যাটেল। তার হয়ে আইনি লড়াই লড়ছেন তারই বড় বোন, পেশায় আইনজীবী ভিদিয়া প্যাটেল। এই চাঞ্চল্যকর মামলায় উঠে এসেছে ডা. প্যাটেলের চিকিৎসক জীবনের অজানা অধ্যায়।

শেয়ার করুন:
পেশাগত গাফিলতির অভিযোগ: কাঠগড়ায় ডা. প্যাটেল, রক্ষাকবচ বোন আইনজীবী ভিদিয়া

পেশাগত দায়িত্ব পালনে গুরুতর গাফিলতির অভিযোগে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বিবেক প্যাটেল। শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এই চাঞ্চল্যকর মামলার শুনানিতে তার উৎকণ্ঠিত চেহারা নিয়ে উপস্থিত ছিলেন একাধিক রোগীও, যারা ডা. প্যাটেলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে এই মামলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অভিযুক্ত চিকিৎসকের বড় বোন ভিদিয়া প্যাটেল নিজেই একজন আইনজীবী হিসেবে তার ভাইয়ের পক্ষে আইনি লড়াই লড়ছেন। ভাই যখন কাঠগড়ায়, তখন বোন তার আইনি সাফাই গাইতে প্রস্তুত, যা আদালতের প্রচলিত রণাঙ্গনে যুক্তিতর্কের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ডা. প্যাটেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রীতিমতো অদ্ভুত এবং গুরুতর। যে দুটি সার্জারিতে তিনি কাজ করেন, সেখানকার দুজন প্র্যাকটিস ম্যানেজার তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। তাদের দাবি, ডা. প্যাটেল সময়ে সময়ে রোগীদের উল্টাপাল্টা ও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ওষুধ লিখে দিতেন। উদাহরণস্বরূপ, যার অ্যাজমা বা হাঁপানি নেই, তাকে অ্যাজমার ওষুধ দেওয়া হয়েছে, আবার যাকে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দেওয়া হয়েছে, তার এই ধরনের কোনো অসুস্থতাই ছিল না। এমন সব অযাচিত প্রেসক্রিপশনের ফলে রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং চিকিৎসার ব্যয়ভার বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

আদালতকক্ষটি ঝকমকে পরিষ্কার এবং ভাবগম্ভীর নৈঃশব্দ্যে আচ্ছন্ন ছিল। বিচারকের এজলাস মেঝে থেকে প্রায় দেড় ফুট উঁচু একটি মঞ্চে স্থাপন করা হয়েছে, যা লাল ভেলভেটে পায়া পর্যন্ত আচ্ছাদিত একটি লম্বা টেবিল দ্বারা সজ্জিত। টেবিলের মাঝামাঝি সিংহাসন আকৃতির চেয়ারটি বিচারকের জন্য নির্ধারিত, আর দুই প্রান্তে আদালতের কর্মীদের জন্য দুটি চেয়ার রাখা হয়েছে। একপাশে কাঠের রেলিং দিয়ে ঘেরা আরামদায়ক গদিআঁটা কিছু চেয়ার জুরিদের জন্য প্রস্তুত ছিল। মঞ্চের পেছনের অংশটি একটি পাতলা প্লাইউডের পর্দার আড়ালে ঢাকা, যেখান থেকে বিচারক আসন গ্রহণের জন্য বেরিয়ে এলে কক্ষে উপস্থিত সবাইকে উঠে দাঁড়াতে হয়।

বিচারকের বাঁ দিকে কাঠগড়া এবং সামনের মেঝেতে একপাশে আইনজীবীদের জন্য ডেস্কসহ চেয়ার ও যাতায়াতের পথ রেখে অন্য পাশে দর্শকদের জন্য চেয়ার পাতা ছিল। একদম পেছনে বিবদমান দুই পক্ষের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিচারক আসন গ্রহণের পর আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমেই জুরি নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। বিচারকের সহকারীরা নাম বলার পর সেই নামের ব্যক্তি বিবদমান দুই পক্ষের সামনে দিয়ে হেঁটে ঘোরাপথে দর্শকসারিতে নিজের আসনে এসে বসেন। হাঁটার সময়ে দুই পক্ষই তীক্ষ্ণভাবে লোকটিকে পর্যবেক্ষণ করে।

এরপর আচমকা খরখরে গলায় কোনো একপক্ষ হেঁকে ওঠে ‘চ্যালেঞ্জ’। আদালতের গুরুগম্ভীর পরিবেশে এই ‘চ্যালেঞ্জ’ ধ্বনি শুনেই চলন্ত ব্যক্তি থমকে দাঁড়িয়ে যায় এবং কিছুটা ভয়ও পায়। নিজ আসনে ফিরে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। ‘চ্যালেঞ্জ’ শব্দের অর্থ হলো, জুরি হিসেবে তাকে কোনো এক পক্ষ চাইছে না। ভিদিয়া প্যাটেল লক্ষ্য করলেন, কুর্তা-পায়জামা পরিহিত, ওড়নায় মাথা ঢাকা, মাঝারি গড়নের উজ্জ্বল ত্বকের পরিণত বয়সের এক মহিলা ‘চ্যালেঞ্জ’-এর মুখে পড়ে বাদ পড়লেন। বাদামি চামড়া, খয়েরি চোখ ও কালো গোঁফওয়ালা একজনও বাতিল হলেন। অবশেষে বারোজন জুরি নির্বাচিত হওয়ার পর বিচারকের বাঁ দিকে রেলিংঘেরা জায়গায় জুরিরা আসন গ্রহণ করলে আসল কাজ শুরু হলো।

প্রথমেই বাদীপক্ষের আইনজীবী অভিযোগ পেশ করলেন। ভিদিয়া অভিযোগ শুনতে শুনতে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো তার ভাইয়ের দিকে তাকালেন। তার চোখে অশেষ স্নেহ ঝরে পড়ছিল। ভাসা-ভাসা চোখে ভীতবিহ্বল বিষণ্নতা নিয়ে মাঝারি উচ্চতার, নম্রভদ্র এবং দেখতে ভালো ডা. প্যাটেল দাঁড়িয়ে ছিলেন। বোনের মনে সূক্ষ্ম এক অপরাধবোধ জাগল। ভিদিয়া ভাবলেন, ডা. প্যাটেল আজকে যে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন, তার পেছনে বোন হিসেবে তারও কি কোনো ভূমিকা ছিল না? ছিল, অবশ্যই ছিল। তিনি নিজে ডাক্তারি পড়তে চাননি। মা-বাবার ইচ্ছার কাছে তিনি হার মানেননি। সমাজে সবার ওপরে থাকার জন্য মা-বাবা তাদের দুই সন্তানকেই ডাক্তার বানানোর নানা চেষ্টা করেছিলেন। মেধাবী ছিলেন দুজনই, তাই ডাক্তারি পড়তে অসুবিধা কোথায়?

ভিদিয়ার মতে, মেধাবী হলেই যে ডাক্তার হওয়া চাই বা হওয়া যাবে, তা কেন? একজন ডাক্তার হতে হলে তার মেধাবী মাথাই যথেষ্ট নয়। সেবা করার জন্য দয়ালু অন্তর এবং পুঁজ-রক্ত-বমি দেখেও সহ্য করার মানসিক শক্তি থাকা চাই। রোগী আসবে গায়ে ঘাম, জ্বর ও অসুখের গন্ধ নিয়ে। ডাক্তারকে সব মেনে নিয়েই প্রেসার ও জ্বর মাপার জন্য রোগীকে স্পর্শ করতে হবে। সেই স্পর্শ শুধু কর্তব্যই নয়, তাতে থাকা চাই ডাক্তারের আন্তরিক সেবার আশ্বাস। ভিদিয়া পরিষ্কার বলেছিলেন, ‘আমি জ্বর, বমি, ঘা, পাতলা পায়খানা কোনো কিছু দেখতে বা ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাই না, তাই ডাক্তার হওয়ার শখ আমার নাই, ইচ্ছাও নাই।’

মা-বাবা তখন বলেছিলেন, ‘পরে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ হবে, তাহলে তো ওইসব ঘাঁটতে হবে না।’ ভিদিয়া দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বলেছিলেন, ‘আমি পাগলের ডাক্তার প্যাটেল হতে চাই না।’ তারপর হেসে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশি বন্ধুরা আমাকে বলবে পাগলের ডাক্তার পটল।’ সেই ভিদিয়া কি তার ছোট ভাইকে মা-বাবার শখ পূরণের জন্য, নাকি তাদের ইচ্ছার কাছে বলি হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত ও প্ররোচিত করেননি? অবশ্যই করেছিলেন। তার ভাই ছিল নরম মনের হৃদয়বান মানুষ। ভাই ডাক্তার হতে চায়নি, কিন্তু ভিদিয়া তাকে অনেক বুঝিয়েছিলেন।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ