জাতীয় সংসদে খাদ্যে ভেজাল এবং মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য সানসিলা জেবরিন। মঙ্গলবার কার্যপ্রণালী-বিধির ৭১ বিধি অনুসারে জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, দেশের বাজারে এখন সরিষার তেলের নামে অন্য তেল, খাঁটি মধুর আড়ালে চিনির সিরাপ, ঘি ও মাখনে নিম্নমানের চর্বি এবং মসলাকে আকর্ষণীয় করতে অনুপযুক্ত রঙের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাংসদ জেবরিন তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন যে, আমরা বাজার থেকে খাবার কিনি ঠিকই, কিন্তু এর সাথে নিরাপত্তা কিনতে পারি না। মোড়কের চাকচিক্য, দাম বা মেয়াদ দেখে পণ্য কেনা হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত উপাদানগুলো চোখে পড়ে না। তিনি উল্লেখ করেন, কোথাও ফল দ্রুত পাকানোর জন্য অননুমোদিত রাসায়নিকের অপব্যবহার করা হচ্ছে, কোথাও একই তেলে বারবার খাবার ভাজা হচ্ছে যা স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর, আবার কোথাও বাসি খাবারকে নতুন মসলা, রং ও সসের আড়ালে 'তাজা' হিসেবে পরিবেশন করা হচ্ছে। রান্নাঘরের সাধারণ মসলা থেকে শুরু করে শিশুর টিফিন—সকাল থেকে রাতের প্রতিটি খাবারের টেবিলেই নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নটি আজ প্রতিটি পরিবারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
খাদ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমানে দুই ধরনের বিপদ বিদ্যমান: একটি চোখে দেখা ভেজাল, আরেকটি চোখে না দেখা মাইক্রোপ্লাস্টিক। পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাগুলোকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়, যা বোতলজাত পানি থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের পাত্রে সংরক্ষিত খাদ্য ও পানীয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এ নিয়ে নিবিড় গবেষণা চলছে। এমনকি অনেক সময় যে কাপকে আমরা 'কাগজের কাপ' ভেবে নিশ্চিন্তে গরম চা বা কফি পান করি, তার ভেতরেও প্লাস্টিকের একটি পাতলা আবরণ থাকতে পারে। তাপের সংস্পর্শে সেই আবরণ থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পানীয়ের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে বিজ্ঞানীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদে ঠিক কতটা ক্ষতি করে, তা নিয়ে গবেষণা এখনও চলমান। তবে বিজ্ঞানীরা প্রদাহ, কোষীয় ক্ষতি, হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সম্ভাব্য ব্যাঘাত এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এই বিষয়ে আমাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে, কারণ তাদের শরীর অপেক্ষাকৃত বেশি সংবেদনশীল এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির শিকার হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
সাংসদ জেবরিন আরও বলেন, খাদ্যে ভেজালের ভয়াবহতা এখন শুধু ভেজাল মেশানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এতটাই কৌশলী হয়ে উঠেছে যে চোখ দিয়ে দেখে ভালো ও খারাপ খাবারের পার্থক্য করাও কঠিন। ঘন দই, টকটকে লাল মরিচ কিংবা চকচকে পাকা ফল দেখতে যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, এর ভেতরের উপাদান কতটা নিরাপদ, একজন সাধারণ ক্রেতার পক্ষে তা জানা সম্ভব নয়। আটা, ময়দা, সুজি ও মসলা থেকে শুরু করে দুধ, দই, ঘি, মাখন, মধু, ভোজ্যতেল, পাউরুটি, কেক, বিস্কুট, নুডলস, চিপস, মিষ্টি, আইসক্রিম, শরবত, আচার, সস এবং বোতলজাত পানি—বিভিন্ন খাদ্যে বিভিন্ন সময়ে ভেজাল, দূষণ কিংবা মানগত ত্রুটির অভিযোগ সামনে এসেছে।
খাদ্য সামগ্রীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা হলো শিশুখাদ্য। বিদেশি নাম, চকচকে মোড়ক কিংবা দামি প্যাকেজিং দেখে আমরা অনেক সময় ধরে নিই পণ্যটি নিশ্চয়ই নিরাপদ। কিন্তু সংসদ সদস্য পরিষ্কারভাবে বলেন যে, বিদেশি নাম নিরাপত্তার সার্টিফিকেট নয় এবং চকচকে মোড়ক বিশুদ্ধতার নিশ্চয়তা নয়। মোড়কের বাইরে কী লেখা আছে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মোড়কের ভিতরে কী আছে। অনিবন্ধিত ও মানহীন শিশুখাদ্যের বিরুদ্ধে তাই আমাদের 'জিরো টলারেন্স' নীতি অবলম্বন করতে হবে, কারণ মানহীন শিশুখাদ্য একটি শিশুকে শুধু আজ অসুস্থ করে না; তার শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের ওপরও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সাংসদ সানসিলা জেবরিন আরও উল্লেখ করেন, রমজান এলে অভিযান, ঈদ এলে মোবাইল কোর্ট, বা উৎসব এলে নজরদারি—এই পদ্ধতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কারণ ভেজাল কোনো মৌসুমি অপরাধ নয়, তাই নিরাপদ খাদ্যের নজরদারিও মৌসুমি হতে পারে না। এই প্রেক্ষাপটে তিনি সরকারের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রস্তাব করেন, যার মধ্যে বোতলজাত পানি, ভোজ্যতেল, দুধ, দই, শিশুখাদ্য, গুঁড়া মসলা, বেকারি পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করা অন্যতম। তার মতে, একটি সমন্বিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগই পারে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে।