ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অবৈধ বসতিগুলোর সঙ্গে যেকোনো ধরনের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার পথে হাঁটছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড আজ, মঙ্গলবার, এই নিষেধাজ্ঞার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারেন বলে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে। হোয়াইট হলের সূত্রের বরাতে মিডল ইস্ট আই আরও উল্লেখ করেছে যে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ২০২৪ সালের জুলাই মাসে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি নিয়ে একটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এই বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্য সেই নির্দেশনা মেনে চলবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রতি দেশটির অঙ্গীকারের একটি প্রতিফলন হবে।
আইসিজের ওই ঐতিহাসিক নির্দেশনায় ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখলদারত্বকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। একই সঙ্গে, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রতি বসতি স্থাপনের বিরোধিতা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়েছিল। এই নির্দেশনার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে, যুক্তরাজ্য সরকারের সম্ভাব্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার আওতায় অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর ব্যবসায়িক খাতে যেকোনো ধরনের নতুন বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করা হতে পারে। এটি কেবল একটি নৈতিক অবস্থান নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার একটি স্পষ্ট পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের জন্য নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ফ্রান্সেসকা আলবানিজ সোমবার জোর দিয়ে বলেছেন, সব দেশেরই বাধ্যবাধকতা রয়েছে যে তারা এই অবৈধ বসতি স্থাপন পরিস্থিতিকে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না। তিনি বলেন, এটি কেবল পছন্দের বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের একটি সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা। র্যাপোর্টিয়ার আলবানিজ আরও মন্তব্য করেন যে, অবৈধ বসতির সঙ্গে বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নীতির ক্ষেত্রে একটি ‘প্রকৃত পরিবর্তনের’ অংশ হতে হবে। তার মতে, এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের দেওয়া নির্দেশনা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা, যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য।
এই পদক্ষেপের সমর্থনে লেবার মুসলিম নেটওয়ার্ক (এলএমএন) ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব জাস্টিস ফর প্যালেস্টিনিয়ানস (আইসিজেপি) গত সপ্তাহে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে তারা যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে অবৈধ ইসরায়েলি বসতিতে ব্রিটিশ নাগরিক বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক ও আর্থিক কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য ‘পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা’ আরোপের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে, অবৈধ বসতির অর্থনীতিকে সহায়তা করে এমন যেকোনো কাজ থেকে বিরত থাকারও অনুরোধ জানানো হয়েছে। তাদের মতে, যুক্তরাজ্যের কেবল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি সম্মান দেখালেই চলবে না, বরং জেনেভা সনদের আওতায় যেকোনো পরিস্থিতিতে এর প্রতি সম্মান নিশ্চিত করতে হবে, যা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
যুক্তরাজ্য সরকারের এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন জেরুজালেমের পূর্বাঞ্চলে ইসরায়েলিদের নতুন ই-ওয়ান বসতি স্থাপনের প্রকল্প নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কিত প্রকল্পটি অধিকৃত পশ্চিম তীরকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত করতে চলেছে, যা শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে। এমন একটি স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্ভাব্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এরই মধ্যে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাজ্য যদি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কাজ করে, তাহলে ইসরায়েলও পাল্টা পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না। এই ধরনের হুমকি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ইসরায়েলের এই প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয় যে, তারা এই নিষেধাজ্ঞাকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত।
এই বিতর্কের মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বড় ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে একটি অপ্রত্যাশিত মন্তব্য করে বসেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, বিতর্কিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাজ্যের নয়; বরং আর্জেন্টিনার। ইয়ার নেতানিয়াহু ইসরায়েলের কোনো মন্ত্রী বা প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ না হওয়া সত্ত্বেও ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে তার এই মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর যুক্তরাজ্যের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে ওয়াশিংটন তাদের অবস্থান আবার ভেবে দেখতে পারে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ এটি যুক্তরাজ্যের জন্য আরও একটি আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
গত বৃহস্পতিবার জিবি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, আর্জেন্টিনা যদি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে আক্রমণ করে বসে, সেই পরিস্থিতিতে তিনি যুক্তরাজ্যকে সমর্থন করবেন না। ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে আরও বলেন, “গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যখন ইরানের ভূখণ্ডে হামলা শুরু করেছিল, তখন আপনাদের দেশ আমাকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেনি।” ট্রাম্পের এই মন্তব্য অবৈধ ইসরায়েলি বসতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এবং পশ্চিমা জোটের মধ্যে ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি কেবল ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর প্রভাব অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিতর্কেও ছড়িয়ে পড়ছে।