দেশের কিন্ডারগার্টেনসহ প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী সকল ধরনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরকারের তদারকির আওতায় আনতে একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই নীতিমালায় উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে, যা তাদের শিক্ষাদান পদ্ধতির গুণগত মান নিশ্চিত করবে। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান।
প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ উল্লেখ করেন যে, বেসরকারি স্কুলগুলোকে নীতিমালার আওতায় আনার বিষয়ে এরই মধ্যে একটি অ্যাডভাইজরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতা নীতিমালার প্রণয়নে প্রতিফলিত হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং শিক্ষার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। তবে, শিক্ষার নামে কোনো ধরনের অসৎ ব্যবসা বা নিম্নমানের কার্যক্রম যেন পরিচালিত না হয়, সেদিকেও সরকার সজাগ দৃষ্টি রাখছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও অন্যান্য প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নিশ্চিত করতে নীতিমালায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ন্যূনতম মানদণ্ডগুলো নির্ধারণ করা হবে। এই মানদণ্ডগুলো এমনভাবে তৈরি করা হবে যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার প্রয়োজনীয় পরিষেবা সঠিকভাবে প্রদান করে। তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন সরকারি তদারকির অধীনে আনা হবে এবং সেই তদারকি কার্যকর করতে নীতিমালাগুলোকে যথেষ্ট কঠোর করা হবে, তবে তা এমন হবে না যা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করতে চায়। প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ স্বীকার করেন যে, নীতিমালা যদি অতিরিক্ত কঠোর হয়, তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার ফলে অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সরকার এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায় না। তাই, কীভাবে একটি কার্যকর অথচ বাস্তবসম্মত ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা চলছে। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগ অটুট রাখা।
বেসরকারি স্কুলগুলোকে নতুন নীতিমালার আওতায় আনার জন্য একটি সম্ভাব্য সময়সীমা নিয়েও আলোচনা চলছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রাথমিকভাবে ২০২৮ সালকে একটি সম্ভাব্য সময়সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, তবে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তিনি বলেন, 'আমরা তাদের ওপর একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিচ্ছি। আপাতত যেহেতু সবকিছু চূড়ান্ত হয়নি, আমরা ২০২৮ সাল নিয়ে আলোচনা করছি।' এই সময়সীমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও স্পষ্ট করেন যে, এই তদারকি শুধুমাত্র কিন্ডারগার্টেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের সঙ্গে যুক্ত সকল ধরনের প্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে সরকারের মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, 'প্রাইমারি এডুকেশন যত ধরনের ইনস্টিটিউশন দিচ্ছে, তাদের সবাইকে সুনার অর লেটার আমরা আমাদের মনিটরিংয়ের অধীনে নিয়ে আসবো।' এটি দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় একটি সুসংহত এবং মানসম্মত কাঠামো তৈরির সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
সরকারের এই পদক্ষেপ দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে, তেমনি অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এটি শিশুদের জন্য একটি শক্তিশালী ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী যেন নিম্নমানের শিক্ষার শিকার না হয় এবং সকলের জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়।