যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ডিসক্রল প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, যা একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে নিশ্চিত করেছে সিএনএন। এই আকস্মিক পদত্যাগের পেছনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে ডিসক্রলের দীর্ঘদিনের মতবিরোধ একটি প্রধান কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডিসক্রলের এই সিদ্ধান্ত মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে বিদ্যমান টানাপোড়েন এবং চলমান বৈশ্বিক সংঘাতের চাপকে আরও প্রকটভাবে তুলে ধরেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, সেক্রেটারি অব ডিফেন্স পিট হেগসেথের সঙ্গে ডিসক্রলের প্রায়শই তীব্র বাদানুবাদ হতো, যা শেষ পর্যন্ত তার পদত্যাগের সিদ্ধান্তে ইন্ধন জুগিয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র আরও নিশ্চিত করেছে যে, ডিসক্রল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বাহিনীর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং এরপরই তিনি তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। উল্লেখ্য, সদ্য সাবেক এই আর্মি সেক্রেটারি ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অ্যানা কেলি এক বিবৃতিতে ডিসক্রলের অবদানের প্রশংসা করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমএজিএ (মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন) এজেন্ডা বাস্তবায়নে সেক্রেটারি ডিসক্রল অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তিনি সামরিক অভিযানে উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং রাশিয়া ও ইউক্রেনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দর কষাকষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তবে, বিবৃতিতে তার পদত্যাগের মূল কারণ সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
এই বছরের শুরুর দিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ দুই জেনারেলের পাশাপাশি আর্মি চিফ অব স্টাফ রেন্ডি জর্জকে বরখাস্ত করেছিলেন। জর্জ ও ডিসক্রল দীর্ঘদিন ধরে একসাথে কাজ করেছেন এবং তাদের মধ্যে পেশাদারিত্বের গভীর সম্পর্ক ছিল। এই বরখাস্তের ঘটনাগুলো পেন্টাগনের অভ্যন্তরে হেগসেথের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল এবং ডিসক্রলের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এই ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ ডিসক্রলের পদত্যাগকে অনিবার্য করে তুলেছে বলেও অনেকে ধারণা করছেন।
ডিসক্রলের পদত্যাগের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত ছয় মাসে গড়িয়েছে। এই সংঘাতের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক সেনা, যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রাখার ফলে বিশ্বের অন্য অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর প্রস্তুতি ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে দেশটির সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের সামরিক অভিযান আরও দীর্ঘায়িত করার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তারা মনে করছেন, এভাবে অভিযান চালিয়ে যাওয়া টেকসই নয় এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যত্র, এমনকি নিজ ভূখণ্ডের নিরাপত্তা মোকাবিলার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ১৪ আগস্টের ‘সেক্রেটারি অব ডিফেন্স অর্ডার্স বুক’ বা এসডিওবিতে এই গোপনীয় মূল্যায়নের বিষয়টি উঠে এসেছে, যেখানে বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক সম্পদের প্রাপ্যতা ও ব্যবহারের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়।
ইরান যুদ্ধের জন্য ইউরোপ, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় দায়িত্ব পালনকারী মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও অন্যান্য সরঞ্জামের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট কমান্ডগুলোর নিজ নিজ এলাকায় মিশন পরিচালনা ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে নৌবাহিনী যুদ্ধকালীন চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে সক্ষমতার সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে। নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল হেগসেথকে জানিয়েছেন, বর্তমান মাত্রায় ইরান যুদ্ধকে আর দীর্ঘ সময় সমর্থন করা সম্ভব নয়, কারণ সংঘাত শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেখা যাচ্ছে না।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং ইরানের পাল্টা আক্রমণ মোকাবিলায় নৌবাহিনীকে বিপুলসংখ্যক যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করতে হয়েছে। পরবর্তী কয়েক মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানি বন্দর অবরোধ কার্যকর করা এবং হরমুজ প্রণালি খুলতে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেও এসব জাহাজ ব্যবহৃত হয়েছে। এই ক্রমাগত মোতায়েন ও অপারেশনাল চাপ নৌবাহিনীর জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে, যা সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে এবং ডিসক্রলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পদত্যাগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।