কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে কয়েক কোটি টাকার দেনার বোঝা সইতে না পেরে এক ব্যবসায়ী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। হারুন অর রশিদ খালেক (৩৮) নামের এই ব্যবসায়ী সোমবার (২৪ আগস্ট, ২০২৬) দিনগত গভীর রাতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার ছোট ভাইকে ফোন করে আকুল আবেদন জানান, “আমার ছোয়ালডা থাকলো তুই দেখিস”। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় বিরিকয়া গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্থানীয় প্রশাসন ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ব্যবসায় তীব্র লোকসান এবং ব্যাংক ও বিভিন্ন মহলের ঋণের চাপ সইতে না পেরেই তিনি এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, খালেক একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন, যিনি ধান, পাট, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন কৃষি পণ্য বেচাকেনা করতেন। বিগত কয়েক বছর ধরে তার ব্যবসায় মন্দা চলছিল, যা তাকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে তোলে। চলতি বছর তার কেনা প্রায় ৫০ লাখ টাকার পেঁয়াজ পচে যাওয়ায় তিনি মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এই বিপুল ক্ষতির সঙ্গে ব্যাংক, এনজিও এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে নেওয়া কয়েক কোটি টাকার ঋণ যুক্ত হয়ে তার উপর এক অসহনীয় চাপ তৈরি করে। এই বিশাল অঙ্কের ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তাই তাকে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, যা শেষ পর্যন্ত এমন এক মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনে।
সোমবার দিনগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে হারুন অর রশিদ খালেক তার ছোট ভাই আব্দুল মালেককে ফোন করেন। সেই ফোনালাপে তিনি আকুতিভরা কণ্ঠে বলেন, “আমার ছোয়ালডা থাকলো, তুই দেখিস”। ভাইয়ের এমন কথা শুনে আব্দুল মালেক উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চান, তিনি কোথায় আছেন। জবাবে খালেক একটি নির্দিষ্ট স্থানের (শফিউল্লাহর আমবাগান) নাম উল্লেখ করে বলেন, “সকালে পাবিনি”। ভাইয়ের কথার গুরুত্ব অনুধাবন করে মালেক দ্রুত তার বাবা সদর উদ্দিন এবং ভাবীকে নিয়ে শফিউল্লাহর আমবাগানে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তারা এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সম্মুখীন হন; একটি আমগাছের ডালে রশিতে ঝুলন্ত অবস্থায় খালেকের নিথর দেহ দেখতে পান।
পরিবারের সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে কুমারখালী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে খালেকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করার পর ময়নাতদন্তের জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। বিরিকয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে পান্টি-যদুবয়রা সড়ক ঘেঁষে অবস্থিত খালেকের বাড়িতে মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। উৎসুক জনতা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও এলাকার পরিবেশ ছিল ভারাক্রান্ত ও নিস্তব্ধ।
নিহত খালেকের বাবা সদর উদ্দিন পুত্র হারানোর শোকে পাথর হয়ে জানান, তার ছেলে কয়েক কোটি টাকা ঋণী ছিলেন এবং সেই ঋণের চাপ সইতে না পেরেই আত্মহত্যা করেছেন। খালেকের স্ত্রী মালা খাতুনও নিশ্চিত করেন যে, তাদের সংসারে কোনো ঝগড়া-ঝামেলা ছিল না, তবে অনেক টাকা দেনা ছিল। তিনি ধারণা করছেন, এই দেনার কারণেই তার স্বামী এমন চরম পথ বেছে নিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খালেকের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জানান, খালেক তাকে দিয়েও পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করিয়েছিলেন এবং একইভাবে অনেকের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে তার দেনার পরিমাণ তিন থেকে চার কোটি টাকা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ঋণের চাপ সইতে না পেরেই হারুন অর রশিদ খালেক আত্মহত্যা করেছেন।” তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে এলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং এ বিষয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ঘটনা সমাজে ঋণের বোঝা এবং তার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
একদিকে ব্যবসায়িক লোকসান, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ – এই দুইয়ের মাঝে পিষ্ট হয়ে একজন সম্ভাবনাময় ব্যবসায়ীকে অকালে ঝরে যেতে হলো। তার শেষ কথাগুলো, “আমার ছোয়ালডা থাকলো তুই দেখিস”, কেবল তার ভাইয়ের প্রতি এক আকুতি ছিল না, বরং তা ছিল সমাজের প্রতি এক নীরব প্রশ্ন, যা আর্থিক সংকটে জর্জরিত অসংখ্য মানুষের অব্যক্ত যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি। এই মর্মান্তিক ঘটনা কুষ্টিয়ার কুমারখালীজুড়ে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে এবং আর্থিক অসচ্ছলতা ও মানসিক চাপের কারণে আত্মহত্যার মতো চরম পদক্ষেপ গ্রহণের প্রবণতা রোধে সামাজিক সচেতনতা ও সহায়তার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে।