যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ দক্ষতার বিদেশি কর্মীদের জন্য ব্যবহৃত এইচ-১বি ভিসার আবেদন ফি এক লাখ ডলারেরও বেশি করার একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এই নতুন নিয়ম কার্যকর হলে প্রতিটি এইচ-১বি ভিসার আবেদনের জন্য ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলার ফি নেওয়া হতে পারে, যা প্রযুক্তি, শিক্ষা, গবেষণা ও অন্যান্য বিশেষায়িত পেশায় বিদেশি কর্মী নিয়োগকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি বিশাল আর্থিক বোঝা তৈরি করবে। প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রকাশনা ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত হয়েছে, এবং আগামী ৩০ দিন এর ওপর জনগণের মতামত নেওয়া হবে। এর চূড়ান্ত অনুমোদন মিললে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) এটি কার্যকর করতে পারবে।
এই প্রস্তাবটি ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি কঠোর করার চলমান প্রচেষ্টারই অংশ। গত বছরও ট্রাম্প প্রশাসন সাময়িকভাবে এইচ-১বি ভিসার ওপর ১ লাখ ডলারের ফি আরোপের চেষ্টা করেছিল। তবে সেই উদ্যোগ একটি ফেডারেল আদালতের রায়ে স্থগিত হয়ে যায়, যেখানে আদালত ওই ফিকে অবৈধ ঘোষণা করে প্রশাসনকে তা আদায় থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয়। সেই বিষয়টি বর্তমানে আপিল আদালতে পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে, এবং একই ধরনের আরেকটি আইনি লড়াই পৃথক একটি আদালতে চলছে। নতুন প্রস্তাবটি মূলত গত বছরের সাময়িক ফি-এর পরিবর্তে একটি স্থায়ী এবং সামান্য বর্ধিত ফি চালু করার লক্ষ্য নিয়ে আনা হয়েছে, যা আইনগতভাবে আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে বলে প্রশাসন মনে করছে।
ট্রাম্প এবং তার সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, অনেক প্রতিষ্ঠান এইচ-১বি ভিসা ব্যবহার করে কম খরচে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে, যার ফলে মার্কিন নাগরিকরা চাকরির সুযোগ হারান। তাদের মতে, এই ধরনের উচ্চ ফি আরোপের মাধ্যমে মার্কিন কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে এবং দেশীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো এই যুক্তির বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবি, কিছু বিশেষায়িত পেশায় যুক্তরাষ্ট্রে পর্যাপ্ত দক্ষ কর্মী পাওয়া যায় না এবং এই ঘাটতি পূরণের জন্য এইচ-১বি ভিসা অপরিহার্য। তাদের আশঙ্কা, এই ভিসা ব্যবস্থা বন্ধ বা কঠিন হয়ে গেলে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মী নিয়োগে সমস্যায় পড়বে এবং বিশ্ব বাজারে তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পাবে।
এই প্রস্তাবিত ফি-এর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী সংগঠন ইউএস চেম্বার অব কমার্স, কয়েকটি অঙ্গরাজ্য, শ্রমিক সংগঠন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। তাদের মূল দাবি হলো, কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া ডিএইচএস এ ধরনের ফি বা কর আরোপ করতে পারে না। তারা আরও যুক্তি দেখায় যে, প্রেসিডেন্টের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ব্যবহার করে এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির মূল আইনকে পাশ কাটানো যায় না। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই ফি কোনো সাধারণ কর নয়, বরং বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ সীমিত করার প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতার আওতায় নেওয়া একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে এইচ-১বি ভিসার চাহিদা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মার্কিন সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ৩ লাখ ৪৪ হাজার এইচ-১বি ভিসার জন্য নিয়োগকর্তারা নিবন্ধন করেছিলেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি কম। ২০২৩ সালে যেখানে প্রায় ৭ লাখ ৯৪ হাজার ভিসার জন্য আবেদন করা হয়েছিল, গত বছরের সংখ্যা ছিল তার অর্ধেকেরও কম। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে, ফি বৃদ্ধি বা যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর হওয়ার আগেই অভিবাসন নীতির পরিবর্তনগুলো বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগ্রহে প্রভাব ফেলছে।
প্রস্তাবিত ফি বৃদ্ধির পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি আবেদনকারীদের আরও কঠোরভাবে যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে এমন একটি নতুন নির্বাচন পদ্ধতির প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে বেশি দক্ষ এবং বেশি বেতন পাওয়া কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর ফলে শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চ বেতনের চাকরিজীবীরাই এইচ-১বি ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। আগস্টের শুরুতে ডিএইচএস আরও একটি পৃথক নিয়ম প্রস্তাব করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত এইচ-১বি কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো বা বিদেশে থাকা কর্মীকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের আবেদনে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ফি যোগ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, নতুন প্রস্তাবিত ফি এবং অন্যান্য কঠোর নীতিগুলো কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগের খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। এর ফলে অনেক ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগে নিরুৎসাহিত হতে পারে। তবে, এই প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হতে হলে জনমত গ্রহণ প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হতে হবে এবং আদালতে চলমান আইনি চ্যালেঞ্জগুলোরও নিষ্পত্তি হতে হবে। এই প্রক্রিয়াগুলো দীর্ঘ ও জটিল হতে পারে, এবং এর চূড়ান্ত ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।