সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম শিশুদের জন্য আসক্তি সৃষ্টিকারী এবং ক্ষতিকর – এমন গুরুতর অভিযোগে মেটা প্ল্যাটফর্মস ইনকর্পোরেটেডের বিরুদ্ধে ক্যালিফোর্নিয়ায় এক ঐতিহাসিক বিচার শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার, ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ তারিখে এই বহুল প্রতীক্ষিত মামলার শুনানি শুরু হয়, যেখানে চারটি মার্কিন রাজ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানটির কাছে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ এবং তাদের প্ল্যাটফর্মের নকশায় মৌলিক পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মেটা জেনেশুনে তাদের অ্যাপসগুলো এমনভাবে ডিজাইন করেছে, যা অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আসক্তি তৈরি করে এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি এবং নিউ জার্সি – এই চারটি রাজ্য মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে যে, কোম্পানিটি ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের নিরাপত্তা বিষয়ে জনসাধারণকে ভুল তথ্য দিয়েছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অ্যাপসগুলোকে আসক্তি সৃষ্টিকারী করে তুলেছে। রাজ্যগুলোর আইনজীবীরা আরও অভিযোগ করেছেন যে, মেটা ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের অভিভাবকদের সম্মতি ছাড়াই নিয়মিতভাবে তাদের ডেটা সংগ্রহ করে গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘন করছে। এই মামলায় প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১৭৩ বিলিয়ন ইউরো) ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে এবং মেটার মূল প্ল্যাটফর্মগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার দাবি জানানো হয়েছে। এটি ২০২৩ সালে ২৯টি রাজ্যের একটি বৃহত্তর জোটের দায়ের করা মামলার অংশ, যেখানে মেটার বিরুদ্ধে অ্যাপসগুলোতে আসক্তি সৃষ্টিকারী ফিচার তৈরির অভিযোগ আনা হয়েছিল।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো থেকে অল্প দূরে ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালতে মঙ্গলবার মামলার প্রারম্ভিক বিবৃতি শুরু হওয়ার কথা ছিল। এই বিচার প্রক্রিয়াটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দায়বদ্ধতা এবং শিশুদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। মামলার রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ ডিজাইন ও ব্যবসায়িক মডেলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই মামলার ফলাফল প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে, যা শিশুদের অনলাইন সুরক্ষার ক্ষেত্রে তাদের দায়বদ্ধতা আরও বাড়িয়ে দেবে।
বিচার চলাকালীন সময়ে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে। মেটার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জুকারবার্গ এই মামলায় অন্যতম প্রধান সাক্ষী হিসেবে আদালতে উপস্থিত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়াও, মেটার প্রাক্তন কর্মচারী এবং বিশেষজ্ঞ সাক্ষী আর্তুরো বেজারকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হয়েছে, যদিও কোম্পানি তার উপস্থিতি আটকাতে চেষ্টা করেছিল। আদালতের নথি অনুযায়ী, রাজ্যগুলোর আইনজীবীরা মেটার নিরাপত্তা অনুশীলন এবং কোম্পানিটি প্রকাশ্যে কী তথ্য জানাতো সে বিষয়ে তিন ঘণ্টা ধরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। এই সাক্ষ্যপ্রমাণ মেটার অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম এবং শিশুদের সুরক্ষায় তাদের প্রকৃত প্রচেষ্টা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচন করতে পারে।
এই মামলায় আটজন উপদেষ্টা জুরি হিসেবে কাজ করছেন, তবে মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিচারক ইভন গঞ্জালেজ রজার্সের হাতে থাকবে। কেনটাকির অ্যাটর্নি জেনারেল রাসেল কোলম্যান এই মামলাটিকে “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বৃহত্তম ভোক্তা সুরক্ষা মামলা” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা জুরিকে দেখাবো যে, মেটা তার পণ্যের কারণে তরুণদের কী ক্ষতি হচ্ছে তা জেনেও গোপন করেছে, কারণ এই সত্য উপেক্ষা করা তাদের জন্য বেশি লাভজনক ছিল।” তার এই মন্তব্য মামলার গুরুত্ব এবং অভিযোগকারীদের দৃঢ় অবস্থানের প্রতিফলন।
অন্যদিকে, মেটা অবশ্য এই অভিযোগগুলোর সঙ্গে তীব্রভাবে দ্বিমত পোষণ করেছে। কোম্পানি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় আমাদের রেকর্ড এবং বছরের পর বছর ধরে সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরিতে আমাদের প্রচেষ্টার জন্য গর্বিত, এমনকি এই মামলাগুলো দায়ের হওয়ার আগেও আমরা এই কাজ করেছি।” মেটা আরও যোগ করে, “আমরা আদালতে বিচারক ও জুরিকে সেইসব তথ্য দেখাতে উন্মুখ।” তাদের এই প্রতিক্রিয়া কোম্পানিটির আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত দেয় যে, তারা আদালতে তাদের অবস্থান প্রমাণ করতে সক্ষম হবে।
এই বিচার প্রক্রিয়াটি ছয় থেকে আট সপ্তাহ ধরে চলবে বলে আশা করা হচ্ছে, এবং অক্টোবরের মধ্যে একটি রায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মামলার ফলাফল কেবল মেটার জন্যই নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সমগ্র শিল্পের জন্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়ে এটি একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ ব্যবহারকারী এবং নীতিনির্ধারকরা এই মামলার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন, যা ভবিষ্যতের ডিজিটাল পরিবেশের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।