প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ হাওয়াইতে ক্যাটাগরি-১ ঘূর্ণিঝড় লালার তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিগ আইল্যান্ডের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে প্রায় ১০০টিরও বেশি বাড়িঘর তাদের ভিত্তি থেকে উপড়ে গিয়ে ভেসে গেছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় অন্তত একজন ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন, যা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ঘূর্ণিঝড়টি সরাসরি স্থলভাগে আঘাত হানেনি, এর পার্শ্ববর্তী প্রভাবই এমন ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
গভর্নর জশ গ্রিন এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বিগ আইল্যান্ডে শতাধিক বাড়িঘর সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বা ভেসে গেছে। তবে, আশ্চর্যজনকভাবে, ভেসে যাওয়া সম্পত্তিগুলির সাথে ব্যাপক প্রাণহানির কোনো খবর এখনও পর্যন্ত তাদের কাছে নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কিছু লোক ছোটখাটো দুর্ঘটনার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা দুর্যোগের তীব্রতার মাঝে কিছুটা স্বস্তির খবর। ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি এবং এর দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতির ব্যাপকতা বিবেচনা করলে, প্রাণহানি কম হওয়াকে একটি অলৌকিক ঘটনা হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
ঘূর্ণিঝড় লালা সরাসরি স্থলভাগে আঘাত না হানলেও, এটি কিছু কিছু অঞ্চলে ৩২ ইঞ্চি (৮১ সেমি) পর্যন্ত বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছে। এই অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা জলরাশি ভয়ংকর স্রোতে পরিণত হয়ে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আঘাত হানে। এর ফলস্বরূপ, গোটা হাওয়াই জুড়ে প্রায় ২,০০,০০০-এরও বেশি পরিবার বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে, যা দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। বিদ্যুতের অভাবে জরুরি পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় লালা বর্তমানে একটি ক্রান্তীয় ঝড়ে পরিণত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং এটি হাওয়াইয়ের দক্ষিণ দিকে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে, তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে বিপদ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। রবিবার হাওয়াই কাউন্টি জানিয়েছে, ঝড়ের আইওয়াল (কেন্দ্রের চারপাশের তীব্র বায়ুপ্রবাহের অঞ্চল) বিগ আইল্যান্ডের সাউথ পয়েন্ট থেকে মাত্র ৩০ মাইল (৪৮ কিমি) দূর দিয়ে বয়ে গেছে, যা আকস্মিক বন্যা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট ছিল। এই পরিস্থিতি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
শনিবার বিকেলে ৯১ মাইল প্রতি ঘণ্টা বেগে বাতাস নিয়ে ঘূর্ণিঝড় লালা তার পূর্ণ শক্তি অর্জন করে। কিন্তু ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টার (NHC) রবিবার ২০:০০ EDT (০০:০০ GMT) এর সর্বশেষ পরামর্শে জানিয়েছে, ঝড়ের বাতাসের গতিবেগ এখন প্রায় ৬৫ মাইল প্রতি ঘণ্টায় নেমে এসেছে। যদিও ঝড়ের তীব্রতা কিছুটা কমেছে, তবুও হাওয়াইয়ের আটটি প্রধান দ্বীপের সবগুলিতেই রবিবার ক্রান্তীয় ঝড়ের সতর্কতা জারি রয়েছে। এই সতর্কতা স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রায় ১৮০ জন হাওয়াই ন্যাশনাল গার্ড সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে। তারা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তা করছেন। রবিবার দুপুর পর্যন্ত, পাওয়ারআউটেজ (PowerOutage) ট্র্যাকার অনুসারে, হাওয়াইতে প্রায় ২,১৯,০০০ গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছেন। তিনটি হাসপাতালও বিদ্যুৎ হারিয়েছে, তবে তাদের ব্যাকআপ জেনারেটর থাকায় জরুরি পরিষেবা চালু রাখা সম্ভব হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক, যা গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
বিগ আইল্যান্ডের দুটি প্রধান বিমানবন্দর, হিলো ইন্টারন্যাশনাল এবং এলিসন ওনিজুক কোনা, সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তবে পরে সেগুলিকে পুনরায় চালু করা হয়েছে। গভর্নর জানিয়েছেন, প্রায় ১৯০টি ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে, যা হাজার হাজার ভ্রমণকারীকে সমস্যায় ফেলেছে। মাউই দ্বীপেও শনিবার কিছু বাসিন্দা জল সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, যা পানীয় জল এবং অন্যান্য দৈনন্দিন প্রয়োজনে গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করেছে। এই ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষতি পুনরুদ্ধারে সময় লাগবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে ক্যাটাগরি-৪ ঘূর্ণিঝড় ইনিকি হাওয়াইতে সর্বশেষ বড় ধরনের আঘাত হেনেছিল। কাওয়াইয়ের দক্ষিণ উপকূলে আঘাত হানা সেই ঘূর্ণিঝড়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। গত কয়েক বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল; সর্বশেষ বড় ঝড় ছিল ২০২৪ সালের অক্টোবরে ফ্লোরিডায় আঘাত হানা ক্যাটাগরি-৩ হারিকেন মিল্টন। এই বছর প্রশান্ত মহাসাগরে একটি শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হয়েছে, যা অস্বাভাবিক উষ্ণ পৃষ্ঠের জলের একটি পর্যায়ক্রমিক ঘটনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বারা আংশিকভাবে চালিত। যেহেতু ঘূর্ণিঝড় এবং টাইফুন উষ্ণ সমুদ্রের জল থেকে শক্তি সঞ্চয় করে, তাই সমুদ্রের তাপমাত্রার এই বৃদ্ধি আরও বেশি সংখ্যক এবং তীব্রতর ঝড় সৃষ্টিতে সহায়ক হতে পারে বলে আবহাওয়াবিদরা আশঙ্কা করছেন।