প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি করতে অ্যাপল তাদের বহু প্রতীক্ষিত আইফোন ১৮ প্রো এবং নিজেদের প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন বাজারে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ডিআরএএম (DRAM) মেমোরি চিপের তীব্র সংকট অ্যাপলের উৎপাদন ব্যবস্থায় গভীর দুশ্চিন্তার জন্ম দিয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় এই চিপের সরবরাহ নিশ্চিত করতে অ্যাপল তাদের উৎপাদন সহযোগীদের সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, কারণ চিপের ঘাটতি আইফোন ১৮ প্রো-এর সামগ্রিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বিশ্লেষক টিম কালপানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি)-এর কারখানায় প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের অ্যাপল প্রসেসর বর্তমানে অলস অবস্থায় পড়ে আছে। পর্যাপ্ত মেমোরি চিপের অভাবে এসব প্রসেসরের প্যাকেজিংয়ের কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। অ্যাপল সাধারণত মাইক্রন, এসকে হাইনিক্স এবং স্যামসাংয়ের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তাদের প্রয়োজনীয় মেমোরি চিপ সংগ্রহ করে থাকে। কিন্তু বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপের অভূতপূর্ব চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই মুহূর্তে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেমোরি চিপের বর্তমান তীব্র সংকটের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত ও ব্যাপক বিস্তারকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এআই নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের ডেটা সেন্টার এবং সার্ভার পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ মেমোরি চিপ ক্রয় করছে, যা বিশ্ববাজারে ডিআরএএম চিপের সরবরাহের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মেমোরি চিপের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্মার্টফোন নির্মাতাদের জন্য প্রয়োজনীয় চিপ সংগ্রহ করা আরও কঠিন করে তুলেছে। এই পরিস্থিতি অ্যাপলের মতো বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্যও ব্যতিক্রম নয়, তাদেরও বর্ধিত ব্যয় এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
আইফোন ১৮ প্রো-তে অ্যাপলের সর্বশেষ এ২০ প্রো চিপ ব্যবহারের কথা রয়েছে, যা টিএসএমসি-এর অত্যাধুনিক দুই ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও প্রসেসর উৎপাদনের কাজটি দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে, তবে প্রয়োজনীয় মেমোরি চিপের ঘাটতির কারণে পরবর্তী ধাপের কাজ, অর্থাৎ প্রসেসর প্যাকেজিং, মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সহজভাবে বললে, অ্যাপলের প্রসেসর তৈরি হয়ে গেলেও সেগুলোকে সম্পূর্ণ কার্যকর করার জন্য যে মেমোরি চিপ প্রয়োজন, তা এখনো হাতে এসে পৌঁছায়নি। ফলস্বরূপ, প্রসেসরের প্যাকেজিং শেষ করা যাচ্ছে না এবং প্যাকেজিং সম্পন্ন না হলে সম্পূর্ণ প্রসেসর আইফোন সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাঠানোও সম্ভব হচ্ছে না, যা সামগ্রিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এক বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
অ্যাপলের আইফোন সংযোজনের কাজে ফক্সকন এবং বিওয়াইডি-এর মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত। প্রসেসর সরবরাহে এই বিলম্বের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে আইফোন তৈরির জন্য নির্ধারিত সময়সীমা কমে যেতে পারে। এর ফলে বাজারে ছাড়ার আগে আইফোন ১৮ প্রো-এর পর্যাপ্তসংখ্যক ইউনিট তৈরি করা নিয়ে ব্যাপক চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও মেমোরি চিপের এই সংকট সত্ত্বেও অ্যাপল এখনও আইফোন ১৮ প্রো বাজারে আনার সময়সূচি পরিবর্তনের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। প্রতিষ্ঠানটি এবং এর উৎপাদন সহযোগীরা প্রাথমিক চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে বলে আশা করছে, তবে মেমোরি চিপের সরবরাহে ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাজারে ফোনটির প্রাপ্যতা সীমিত হতে পারে এবং গ্রাহকদের দীর্ঘ অপেক্ষার সম্মুখীন হতে হতে পারে।
সময়মতো পর্যাপ্ত চিপ সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে বাজারে ছাড়ার সময় আইফোন ১৮ প্রো-এর মজুত কম থাকতে পারে। এর ফলে অনলাইনে ফোন অর্ডার করা ক্রেতাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে এবং খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রগুলোয়ও পর্যাপ্ত মজুত না থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিম কুকও প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, অ্যাপল সরবরাহব্যবস্থায় 'খুবই গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতার' মুখোমুখি হচ্ছে। মেমোরি চিপের দাম বাড়ার প্রভাব অ্যাপলের পণ্যের দামেও পড়তে পারে। মেমোরির বর্ধিত খরচের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে কিছু পণ্যের দাম বাড়িয়েছে বলেও জানা গেছে। একইসঙ্গে, উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পণ্যের অগ্রাধিকারও পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে, যা অ্যাপলের কৌশলগত পরিকল্পনার একটি অংশ।
এদিকে, আইফোন ১৮ প্রো-এর পাশাপাশি অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল আইফোনও বাজারে আসতে পারে বলে প্রযুক্তি মহলে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ফোনটির সম্ভাব্য নাম 'আইফোন আলট্রা' বলা হয়েছে এবং এর দাম ২ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। যদি এটি সত্য হয়, তবে এটি হবে অ্যাপলের ইতিহাসের সবচেয়ে দামি আইফোন। মেমোরি চিপের এই সংকট ফোল্ডেবল আইফোনের মতো প্রিমিয়াম পণ্যের উৎপাদন এবং বাজারে ছাড়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে, যা অ্যাপলের জন্য একটি কৌশলগত বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।