বৃহস্পতিবার, 9 জুলাই 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে গ্রাম প্লাবিত, কুশিয়ারাসহ অন্যান্য নদীতেও বিপৎসীমা অতিক্রম, বন্যার শঙ্কা

হবিগঞ্জে পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে খোয়াই নদীর দুটি বাঁধ ভেঙে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জেলার কুশিয়ারাসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানিও বিপৎসীমা অতিক্রম করায় বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে।

শেয়ার করুন:
হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে গ্রাম প্লাবিত, কুশিয়ারাসহ অন্যান্য নদীতেও বিপৎসীমা অতিক্রম, বন্যার শঙ্কা

হবিগঞ্জ, ১০ জুলাই ২০২৬: টানা ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে হবিগঞ্জের নদ-নদীগুলোতে পানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সদর উপজেলার লস্করপুরের কালিগঞ্জ এবং বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর এলাকায় খোয়াই নদীর দুটি স্থানে বাঁধ ভেঙে গেছে। এই আকস্মিক ভাঙনের ফলে নদী তীরবর্তী কয়েকটি গ্রাম সম্পূর্ণরূপে প্লাবিত হয়েছে, যার জেরে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দিবাগত রাতে কালিগঞ্জ এলাকায় প্রথম বাঁধ ভাঙনের ঘটনা ঘটে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বাঁধ ভাঙার পরপরই প্লাবিত এলাকার বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গ্রামবাসী তাদের গবাদি পশু এবং প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে শুরু করেন। এই মুহূর্তে তাদের প্রধান উদ্বেগ হলো জানমাল রক্ষা করা। শুধু খোয়াই নদীই নয়, জেলার অন্যতম প্রধান নদী কুশিয়ারাসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানিও বর্তমানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদী তীরবর্তী এলাকা এবং হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদজুড়ে এখন বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান আকাশ বাণীকে জানিয়েছেন, খোয়াই নদীর দুটি স্থানে বাঁধ ভেঙেছে এবং আরও কয়েকটি স্থানে ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, যদি আগামী দিনগুলোতে ভারী বৃষ্টিপাত না হয়, তবে নদ-নদীগুলোতে পানি ধীরে ধীরে কমে আসার সম্ভাবনা আছে। তবে, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে স্থানীয় জনগণের সহায়তায় বস্তায় মাটি ভরে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার কাজ চালানো হচ্ছে, যাতে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়। এই মুহূর্তে প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি জানান।

পাউবো সূত্রমতে, উজান এবং দেশের অভ্যন্তরে অবিরাম ভারী বৃষ্টিপাতের কারণেই নদ-নদীগুলোর পানি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার ২.২৫ সেন্টিমিটার এবং আজমিরীগঞ্জ পয়েন্টে কালনী কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া করাঙ্গী, সুতাং এবং সোনাই নদীর পানিও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এই নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রয়েছে। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল এবং ১ হাজার ৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১ হাজার ৬২০ প্যাকেট শুকনো খাবার ইতোমধ্যে উপবরাদ্দ করা হয়েছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া যায়। তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও ত্রাণ সহায়তা প্রস্তুত রাখা হবে।

প্রতি বছর বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে হবিগঞ্জের নদ-নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি পাওয়া একটি সাধারণ ঘটনা হলেও, এবার বাঁধ ভাঙন এবং একাধিক নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করা পরিস্থিতিকে গুরুতর করে তুলেছে। এর ফলে নদী তীরবর্তী এবং নিম্নাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। কৃষিজমি, ঘরবাড়ি, এবং অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রতি বছরই তাদের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়, যা তাদের জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়।

বর্তমানে হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে, প্রকৃতির খেয়াল এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাসই নির্ধারণ করবে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে। এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে স্থানীয়দের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ