কুমিল্লার প্রাণপ্রবাহ গোমতী নদীর দুই পাড় অবৈধ দখলমুক্ত করতে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। দীর্ঘদিন ধরে নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও তীরবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই, ২০২৬) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই অভিযান পরিচালিত হয়। নদী ও এর পরিবেশ রক্ষায় পাউবোর এই উদ্যোগকে স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবিদরা স্বাগত জানিয়েছেন, যা কুমিল্লার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জলপ্রবাহ সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রথম দিনের এই উচ্ছেদ অভিযান কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার ঝাঁকুনিপাড়া এলাকা থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তুতকৃত তালিকা অনুযায়ী, গোমতী নদীর দুই পাড়ে মোট ১৪৯টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে অপসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথম দিনের অভিযানে এই তালিকাভুক্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে প্রায় ৬০টি অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে। অভিযান সফল করতে অত্যাধুনিক এক্সাভেটরসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই কার্যক্রম সুসম্পন্ন হয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের নেতৃত্ব দেন কুমিল্লা সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাশিয়াত আক্তার এবং কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান খান। তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই কার্যক্রম অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন। কর্মকর্তারা জানান, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও বাঁধের সুরক্ষায় এই ধরনের অভিযান অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল, কারণ অবৈধ স্থাপনাগুলো নদীর বাস্তুতন্ত্র ও পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুতর প্রভাব ফেলছিল।
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান খান এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে গোমতী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং এর তীরবর্তী এলাকায় অবৈধভাবে বিভিন্ন ধরনের দোকান, ঘর ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এই অবৈধ স্থাপনাগুলো শুধু বাঁধের নিরাপত্তাই বিঘ্নিত করছে না, বরং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম এবং বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায়ও মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।” তিনি আরও যোগ করেন, এই দখলদারিত্বের ফলে নদীর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে এবং আশেপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে।
নদীর তীর দখল করে স্থাপনা নির্মাণের ফলে কেবল পরিবেশগত ভারসাম্যই নষ্ট হয় না, বরং এটি নদীর বাস্তুতন্ত্রের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হয়, জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে এবং নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিলীন হতে থাকে। গোমতী নদী কুমিল্লার কৃষি ও জনজীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, এবং এর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এই অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যাবশ্যক। এই উচ্ছেদ অভিযান তাই কেবল অবৈধ স্থাপনা অপসারণ নয়, বরং একটি সুস্থ ও প্রাণবন্ত নদী ফিরিয়ে আনার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান খান আরও দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, এই অভিযান একদিনের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। তিনি নিশ্চিত করেন, “গোমতী নদীর তীর এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সম্পূর্ণভাবে দখলমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এই পর্যায়ক্রমিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।” তার এই বক্তব্য সরকারের দৃঢ় সংকল্পের ইঙ্গিত দেয় যে, নদী দখলমুক্ত করার এই প্রক্রিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং এটি সম্পূর্ণ সফল না হওয়া পর্যন্ত থামবে না। স্থানীয় প্রশাসন ও পাউবোর সমন্বিত এই প্রচেষ্টা গোমতীকে তার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ-নদী অবৈধ দখল ও দূষণের শিকার। এমতাবস্থায়, গোমতী নদীর ওপর পরিচালিত এই উচ্ছেদ অভিযান দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও নদী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে উৎসাহ জোগাবে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে নদী দখলের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল, এবং এই অভিযান তাদের দাবির প্রতি সরকারের ইতিবাচক সাড়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কুমিল্লার গোমতী নদী তার স্বাভাবিক রূপ ফিরে পেলে তা কেবল স্থানীয় পরিবেশেরই উন্নতি ঘটাবে না, বরং এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এটি একটি টেকসই পরিবেশ ও নিরাপদ জনজীবনের দিকে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।