মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এক চাঞ্চল্যকর ঘোষণায়, ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে যে, তাদের নৌ ও বিমান বাহিনী যৌথভাবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত ৮৫টি 'গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনায়' ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এই হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে 'প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া' হিসেবে অভিহিত করেছে ইরান, যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সংঘাতের এক ভয়াবহ আশঙ্কা তৈরি করেছে।
আইআরজিসি-এর প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, বুধবার (৮ জুলাই ২০২৬) ভোরের দিকে পরিচালিত এই ব্যাপক হামলায় বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের প্রধান ঘাঁটি এবং কুয়েতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলী আল-সালেম বিমান ঘাঁটি সরাসরি আঘাত হেনেছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এলো যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, এবং উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনের অভিযোগ আনছে।
হামলার পরপরই বাহরাইন জুড়ে বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বাজতে শোনা যায়, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দ্রুত একটি বিবৃতি জারি করে জানায় যে, তাদের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বুধবার বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সফলভাবে আকাশেই ধ্বংস বা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। কুয়েত যদিও ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের কোনো বিস্তারিত তথ্য জানায়নি, তবে পরিস্থিতি যে গুরুতর তা স্পষ্ট।
ইরানের তরফ থেকে এই হামলাকে কোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে অস্বীকার করা হয়েছে। আইআরজিসি জোর দিয়ে বলেছে যে, এটি মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি 'প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া' মাত্র। তেহরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজের তথ্যমতে, এই হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে বুধবার ভোরের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমুজগান ও মাহশাহরের উপকূলীয় সামরিক ঘাঁটি এবং বেশ কিছু অসামরিক স্টেশনে বিমান হামলা চালিয়েছিল। এই মার্কিন হামলাকেই ইরান তাদের পাল্টা পদক্ষেপের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
আইআরজিসি যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলাকে 'যুদ্ধবিরতি' এবং 'ইসলামাবাদ চুক্তি'র ১৪টি ধারার চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা ওয়াশিংটনকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, "অপরাধী আমেরিকা যদি এভাবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করতে থাকে, তবে এই অঞ্চলের প্রতিটি মার্কিন ঘাঁটি আমাদের ড্রোনের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।" ইরান আরও অভিযোগ করেছে যে, তাদের প্রয়াত নেতার জানাজার ঐতিহাসিক মিছিল থেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতেই মূলত ওয়াশিংটন এই হামলা চালিয়েছিল, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে তাদের হামলার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছে। সেন্টকম জানিয়েছে, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ইরান যে হামলা চালিয়েছিল, তার পাল্টা জবাব দিতেই মার্কিন বাহিনী বুধবার ভোরে ইরানের ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করিডোরে নির্বিঘ্নে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে এবং ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতেই এই অভিযান চালানো হয়।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে দুই পক্ষ যেভাবে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, তাতে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে তা পুরো অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। উভয়পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা ও হুমকির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই মুহূর্তে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে এবং উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে। তবে, যেভাবে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা চলছে, তাতে শান্তির সম্ভাবনা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।