ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতে জড়ানো থেকে দক্ষিণ কোরিয়াকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে সিউলে মার্কিন দূতাবাসের বাইরে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনারও তীব্র বিরোধিতা করেছেন বিক্ষোভকারীরা। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তার নামে দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণ সেনাদের একটি বিদেশি যুদ্ধে পাঠানো উচিত নয়।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী, যা বৈশ্বিক মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করে থাকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অঞ্চলে 'নিরাপত্তায় অবদান' রাখার জন্য তার মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। এই চাপের মুখে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার যখন হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং সেখানে সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করছে, ঠিক তখনই এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হলো। বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে 'অবৈধ যুদ্ধ' চালানোর অভিযোগ এনে স্লোগান দিয়েছেন এবং তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, 'আগ্রাসনের যুদ্ধে যোগ দেবেন না' এবং 'আমরা আমাদের তরুণদের মৃত্যুর সাগরে পাঠাতে পারি না' - যা তাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
বিক্ষোভের একদিন আগে দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল যে, তারা হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে একটি তথ্য-অনুসন্ধানী দল পাঠিয়েছে। তবে একই সঙ্গে সরকার স্পষ্ট করে জানায়, সেখানে নৌবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এই সতর্ক অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, সিউল এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে এগোতে চাইছে, যেখানে একদিকে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের চাপ রয়েছে এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ জনমত ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয় জড়িত।
হরমুজ প্রণালীতে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা নিয়ে দেশটির ভেতরেই একটি জোরালো বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে ওয়াশিংটনের চাপকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং জোটের প্রতি অঙ্গীকার বজায় রাখার পক্ষে সওয়াল করছে। তাদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের সুরক্ষায় দক্ষিণ কোরিয়ারও একটি ভূমিকা থাকা উচিত।
অন্যদিকে, বিরোধীরা আশঙ্কা করছেন যে, ইরান যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়লে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাদের নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে এবং এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাবে। তারা মনে করেন, একটি বিদেশি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে এবং এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর। এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এই সংঘাতের অর্থনৈতিক দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়া তার জ্বালানি চাহিদার একটি বিশাল অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, যা হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। এই প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। তবে সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়লে সম্ভাব্য পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকি বা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যা সিউলের জন্য একটি কঠিন অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের বিষয়।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, দক্ষিণ কোরিয়ার এই সিদ্ধান্ত অন্যান্য মার্কিন মিত্র দেশগুলোর জন্যও একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। ওয়াশিংটন তার মিত্রদের কাছে এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য যে আহ্বান জানাচ্ছে, তাতে সিউলের পদক্ষেপের একটি নিজস্ব প্রভাব থাকবে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যেও সামান্য হলেও পরিবর্তন আনতে পারে এবং ইরান-মার্কিন সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার বর্তমানে একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের জোট সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধের বিরোধিতা এবং সেনাদের সুরক্ষার দাবি উপেক্ষা করতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে সিউলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।