ইরানের স্বাস্থ্যসেবা খাত বর্তমানে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে। একদিকে যেমন ওষুধের দাম আকাশ ছুঁয়েছে, তেমনি অন্যদিকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অসংখ্য রোগী তাদের চিকিৎসা নিতে পারছেন না। চিকিৎসকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে বহু মানুষ অকালে প্রাণ হারাতে পারেন। একটি কেমোথেরাপি সেশনের খরচ মাসিক ন্যূনতম মজুরির ছয় গুণ হওয়ার মতো ঘটনা এখন ইরানে সাধারণ হয়ে উঠেছে, যা যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা এবং মুদ্রার লাগামহীন অবমূল্যায়নের ফলস্বরূপ সৃষ্ট স্বাস্থ্য খাতের চরম দুরবস্থার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে।
তেহরানের এক ৭০ বছর বয়সী স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত বৃদ্ধার কথাই ধরা যাক। চিকিৎসকরা তার জন্য প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে মোট ছয়টি কেমোথেরাপি সেশন নির্ধারণ করেছিলেন। প্রতিটি সেশনের আনুমানিক খরচ ছিল ১০০ মিলিয়ন ইরানি তোমান (যা প্রায় ৫৩০ মার্কিন ডলারের সমতুল্য)। অথচ, ইরানের শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি মাত্র ১৬.৬ মিলিয়ন তোমান। এর অর্থ দাঁড়ায়, ওই বৃদ্ধার একটি মাত্র কেমোথেরাপি সেশনের খরচ মাসিক ন্যূনতম মজুরির প্রায় ছয় গুণ! তার সন্তানেরা আর্থিক সংস্থানের জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালালেও, তারা চিকিৎসকের কাছে পরবর্তী সেশন স্থগিত করার অনুরোধ জানাতে বাধ্য হয়েছেন। অস্ট্রিয়া-ভিত্তিক ইরানি চিকিৎসক এবং অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথকেয়ার প্রফেশনালস ফর হিউম্যান রাইটস-অস্ট্রিয়ার নির্বাহী বোর্ডের সদস্য হামিদ হেম্মতপুর-এর সহকর্মীদের কাছ থেকে এই মর্মান্তিক ঘটনা জানা গেছে।
এই বৃদ্ধার গল্প ইরানে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। হামিদ হেম্মতপুর এবং অস্ট্রিয়া-ভিত্তিক আরেক ইরানি চিকিৎসক হাসান নায়েব হাশেমের মতে, দেশজুড়ে মূল্যবৃদ্ধি, ওষুধের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তরে বাধা এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উপর ক্রমবর্ধমান চাপ রোগীদের জন্য চিকিৎসা প্রাপ্তি ক্রমশ কঠিন করে তুলছে। বহু পরিবার তাদের প্রিয়জনদের জীবন বাঁচানোর জন্য চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি ইরানের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে, যেখানে জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক অধিকারটুকুও অধরা থেকে যাচ্ছে।
সম্প্রতি, ইরানের একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি তাদের ৮২টি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা করেছে, যা এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট করে তোলে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-এর সঙ্গে সম্পর্কিত সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই ওষুধগুলোর গড় মূল্য প্রায় ১৮০,০০০ তোমান থেকে ৩৯০,০০০ তোমানে উন্নীত হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ১২০% বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ছিল আরও ভয়াবহ। যেমন, ডনেপেজিলের দাম প্রায় ৫৪৩%, ক্লারিথ্রোমাইসিনের দাম প্রায় ৩০৮% এবং অ্যামোক্সিসিলিনের দাম প্রায় ১১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি, কিছু অ্যাসিটামিনোফেন এবং ডাইফেনহাইড্রামিন সিরাপের দামও প্রায় ১৩৫% বেড়েছে। যদিও এই পরিসংখ্যানগুলো একটি একক নির্মাতার সঙ্গে সম্পর্কিত, তবুও এটি বহু রোগীর উপর চেপে বসা আর্থিক চাপের ব্যাপকতা বোঝাতে যথেষ্ট।
যারা ইনসুলিন ব্যবহার করেন, তারা এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। হামিদ হেম্মতপুর জানান, ইনস্যুরেন্সের পর চারটি নভোর্যাপিড ইনসুলিন পেনের মাসিক খরচ প্রায় ২৮০,০০০ তোমান থেকে বেড়ে ১.১ মিলিয়ন তোমানে দাঁড়িয়েছে। এই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম বৃদ্ধির ফলে অসংখ্য ডায়াবেটিস রোগী তাদের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন না, যা তাদের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। অনেক রোগীর জন্য এই ওষুধগুলো জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য, এবং তাদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া মানে তাদের জীবনযাত্রার মান এবং আয়ুষ্কালের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়া।
হাসান নায়েব হাশেম সতর্ক করে বলেছেন যে, অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসার সুযোগ কমে গেলে এর ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। তিনি বলেন, “যদি ওষুধ দুর্লভ হয়ে পড়ে, তবে রোগীদের মধ্যে জটিলতা অনেক দ্রুত দেখা দিতে পারে। এর সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকি হলো অকাল মৃত্যু।” অনেক ক্ষেত্রে, বিকল্প ওষুধ ব্যবহার করাও বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। তিনি আরও যোগ করেন, “অনেক নির্দিষ্ট রোগের জন্য কার্যকরভাবে কোনো বিকল্প নেই।” এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে রোগীদের কাছে কোনো উপায় থাকে না, এবং তারা অসহায়ভাবে পরিস্থিতির শিকার হন।
বিশেষ করে ক্যান্সার রোগীরা এই পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তাদের চিকিৎসার সময়সূচি প্রায়শই অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও কঠোরভাবে নির্ধারিত থাকে। চিকিৎসায় সামান্য বিলম্বও থেরাপির কার্যকারিতা হ্রাস করতে পারে এবং সামগ্রিক ফলাফলের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। হামিদ হেম্মতপুর জানান, কিছু রোগী বিদেশে থাকা চিকিৎসকদের কাছে ক্যান্সার ওষুধের জন্য অনুরোধ করছেন, আবার অনেকে খরচ জানার পর চিকিৎসা স্থগিত করতে বা পুরোপুরি বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন। কেইট্রুডা (পেমব্রোলিজুমাব) নামক একটি ক্যান্সার ড্রাগ এর একটি উদাহরণ। হেম্মতপুর-এর মতে, এর ইরানি সংস্করণের দাম প্রায় ৭০ মিলিয়ন তোমান, যা মাসিক ন্যূনতম মজুরির চার গুণেরও বেশি। এই ধরনের পরিস্থিতি ইরানের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছে।