সোমবার, 24 আগস্ট 2026
⚠ ব্রেকিং
মধ্যপ্রাচ্য 🇧🇩 বাংলা

সৌদির নতুন পাঠ্যবইয়ে ফিলিস্তিনের নাম উধাও, জেরুজালেম ছাড়ার বাক্যও বাদ: গবেষণায় চাঞ্চল্য

সম্প্রতি ইসরায়েলভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইমপ্যাক্ট-সের এক পর্যালোচনায় সৌদি আরবের নতুন পাঠ্যবইয়ে ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের তথ্য উঠে এসেছে। নতুন সংস্করণের মানচিত্র থেকে ফিলিস্তিনের নাম বাদ পড়েছে এবং 'মুসলিমরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না' বাক্যটিও সরানো হয়েছে।

শেয়ার করুন:
সৌদির নতুন পাঠ্যবইয়ে ফিলিস্তিনের নাম উধাও, জেরুজালেম ছাড়ার বাক্যও বাদ: গবেষণায় চাঞ্চল্য

সম্প্রতি ইসরায়েলভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইমপ্যাক্ট-সের (IMPACT-se) এক বিস্তারিত পর্যালোচনায় সৌদি আরবের নতুন শিক্ষাক্রমে ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৪-২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রণীত এই পাঠ্যবইগুলোতে এমন কিছু রদবদল আনা হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংস্থাটির প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন সংস্করণের মানচিত্র থেকে ফিলিস্তিনের নাম সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ‘মুসলিমরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’—এই বহুল প্রচলিত বাক্যটিও পাঠ্যবই থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো সৌদি আরবের শিক্ষানীতি ও আঞ্চলিক সম্পর্ক বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ইমপ্যাক্ট-সের জুলাই মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একাদশ শ্রেণির আরবি ভাষার বই থেকে ‘মুসলিমরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’ বাক্যটি বাদ দেওয়া হয়েছে। আগের সংস্করণগুলোতে এই বাক্যটি জেরুজালেমকে মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান সংঘাতের একটি মূল ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করত। সংস্থাটি মনে করছে, এই বাক্যটি বাদ দেওয়ার মাধ্যমে সৌদি পাঠ্যবইয়ে সংঘাতের সুর কিছুটা কমানো হয়েছে এবং সহাবস্থানের একটি নতুন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

পাঠ্যবইয়ের মানচিত্রে আনা পরিবর্তনগুলোও সমানভাবে উল্লেখযোগ্য। ইমপ্যাক্ট-সে জানিয়েছে, পূর্ববর্তী কিছু সংস্করণে ইসরায়েলের নাম উল্লেখ না করে পুরো ভূখণ্ডকে ‘ফিলিস্তিন’ হিসেবে দেখানো হতো। তবে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের নতুন বইগুলোতে সেই মানচিত্রগুলো থেকে ‘ফিলিস্তিন’ নামটি সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও এই মানচিত্রগুলোতে ইসরায়েলের নামও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, তবুও ফিলিস্তিনের নাম বাদ যাওয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ফিলিস্তিনি পরিচয়ের ওপর সৌদি আরবের অবস্থানের সম্ভাব্য পরিবর্তনকে নির্দেশ করে।

শব্দচয়নেও এসেছে পরিবর্তন। একাদশ শ্রেণির ইতিহাসের একটি বইয়ে ‘ইহুদিবাদী শত্রু’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘ইসরায়েলি দখলদারত্ব’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। ইমপ্যাক্ট-সে এই পরিবর্তনকে ইসরায়েলবিরোধী ভাষার তীব্রতা কমানোর একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তবে, সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে যে, যদি ‘ইসরায়েলি দখলদারত্ব’ শব্দটি পুরো ইসরায়েল রাষ্ট্রকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা এখনও ইসরায়েলকে একটি বৈধ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার অবস্থানকেই প্রতিফলিত করে। এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো সৌদি আরবের কূটনৈতিক ভাষা ও আঞ্চলিক নীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ইসলামবহির্ভূত বিশ্বাস নিয়ে কিছু বিষয়ও নতুন পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ইমপ্যাক্ট-সের পর্যালোচনা অনুযায়ী, ইসলামী শিক্ষা বিষয়ের একটি বইয়ে অমুসলিমদের পরকালে শাস্তি পাওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া একটি কোরআনের আয়াত সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে ইসলামকে সত্য ধর্ম হিসেবে তুলে ধরা অন্য একটি আয়াত যুক্ত করা হয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে কম বিতর্কিত। এছাড়াও, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অসুস্থ এক ইহুদি বালককে দেখতে যাওয়ার একটি হাদিসও নতুন সংস্করণ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ইমপ্যাক্ট-সে এই পরিবর্তনগুলোকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি অধিক গ্রহণযোগ্যতা ও সহনশীলতার ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছে।

ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত বিভিন্ন বিষয়ও সৌদি পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তবে, কিছু জায়গায় ইহুদিবাদীদের ‘চতুর ও ধূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা পুরোপুরি নেতিবাচক ধারণা থেকে মুক্ত নয়। একটি পাঠে ইসরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও ইহুদিবাদী নেতা খায়েম ওয়াইজম্যানের সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজের সঙ্গে সাক্ষাতের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওয়াইজম্যান ফিলিস্তিন ইস্যুতে সৌদি অবস্থান বদলাতে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ইমপ্যাক্ট-সে এই বর্ণনাকে ইহুদিবাদীদের ষড়যন্ত্রমূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে মন্তব্য করলেও, তারা স্বীকার করেছে যে ওয়াইজম্যানের ওই প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলোর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, ইমপ্যাক্ট-সের ২০২৬ সালের পর্যালোচনায় সৌদি শিক্ষাক্রমে শান্তি, সহাবস্থান ও সহনশীলতার ওপর জোর দেওয়ার একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে, সৌদি পাঠ্যবইয়ে উগ্রবাদ ও অসহিষ্ণু বিষয়বস্তু কমানোর পাশাপাশি ইসরায়েল ও ইহুদিবাদ নিয়ে ব্যবহৃত ভাষার তীব্রতাও ধীরে ধীরে নরম করা হচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ এবং আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের একটি আধুনিক ও সহনশীল রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ