মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা শান্তি পরিকল্পনা ইসরায়েল কর্তৃক প্রত্যাখ্যানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক এবং মিশরসহ আটটি আঞ্চলিক শক্তি। রবিবার (আগস্ট ১৬, ২০২৬) এই দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের এই অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেন। এই নিন্দার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল যখন মার্কিন দূত জ্যারেড কুশনার এবং গাজা শান্তি দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ মিশরে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী ও হামাসের সাথে যুদ্ধবিরতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক সপ্তাহ আগে গাজার জন্য ১৫-দফা পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, হামাসকে 'সত্যিকার অর্থে' নিরস্ত্রীকরণ না করা পর্যন্ত কোনো সামরিক প্রত্যাহার হবে না। ট্রাম্পের 'বোর্ড অব পিস' গত মাসে ঘোষণা করেছিল যে, তারা গাজায় হামাস এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। তবে ইসরায়েলের এই প্রত্যাখ্যান মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে এক নতুন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ট্রাম্পের 'বোর্ড অব পিস' দ্বারা প্রণীত এই ১৫-দফা রূপরেখা অনুযায়ী, হামাস তার অস্ত্র সমর্পণ করলে ইসরায়েলি সেনারা গাজা থেকে প্রত্যাহার করে নেবে। এরপর একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী বাহিনী নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর সাথে যৌথভাবে গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এই পরিকল্পনাটি গত মাসে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন এবং এটিকে গাজা উপত্যকায় যুদ্ধের অবসানের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
আটটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তাদের রবিবার প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলেন, “এই রূপরেখা প্রত্যাখ্যান ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট অস্বীকৃতি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপক প্রচেষ্টাকে সরাসরি ব্যাহত করার হুমকি দিচ্ছে।” তারা আরও যোগ করেন, “এই ধরনের প্রত্যাখ্যান নিশ্চিত করে যে ইসরায়েল এখন গাজা এবং অন্যান্য অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে শান্তি আনার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী।”
বিবৃতিতে 'বোর্ড অব পিস' এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয় যেন তারা তাদের ম্যান্ডেটের মধ্যে 'ব্যাপক পরিকল্পনার' অখণ্ডতা বজায় রাখতে এবং কোনো পক্ষকে এর বাস্তবায়নে বাধা দিতে না দিতে অবিলম্বে ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এরই মধ্যে, বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে যে, কুশনার রবিবার হামাস প্রধান খলিল আল-হায়্যার সাথে বৈঠক করেছেন। কুশনার ও ম্লাদেনভ মিশরে মিশর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের সাথে এই চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং কুশনারের সোমবার নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠক করার কথা রয়েছে।
গত ৩০ জুলাই, হামাস 'নিরস্ত্রীকরণ' শব্দটি ব্যবহার করা এড়িয়ে গেলেও জানিয়েছিল যে, তারা 'বোর্ড অব পিস'-এর তত্ত্বাবধানে গাজায় একটি নতুন ফিলিস্তিনি শাসন সংস্থার কাছে তাদের অস্ত্র হস্তান্তর করবে। তবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি দেশ কর্তৃক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে মনোনীত এই গোষ্ঠীটি মধ্যস্থতাকারী এবং 'বোর্ড অব পিস'-এর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা ইসরায়েলকে পরবর্তী পদক্ষেপের রূপরেখা অনুমোদনে 'বাধ্য' করে।
এর আগে, নেতানিয়াহু বলেছিলেন যে, শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী জানান, “তাদের কিছু ধারণা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং কিছু নয়, এবং আমরা এই বিষয়ে আমাদের অবস্থানে অটল থাকতে জানি।” কিন্তু আটটি দেশের যৌথ নিন্দা ইসরায়েলের উপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং গাজায় শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গাজার দুই মিলিয়নেরও বেশি বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে এবং ইসরায়েলি বাহিনী উপত্যকার বৃহৎ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এক বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সকলের দৃষ্টি এখন কুশনারের ইসরায়েল সফর এবং নেতানিয়াহুর সাথে তার বৈঠকের ফলাফলের দিকে নিবদ্ধ, যা এই সংকটের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।