যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার সম্প্রতি মিশরে হামাসের নবনিযুক্ত নেতা খলিল আল-হায়্যার সঙ্গে এক বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। এই আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে কেন্দ্রীভূত ছিল, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিরসনে একটি নতুন কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফিলিস্তিনি একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন যে, গত রবিবার মিশরে এই ঐতিহাসিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা।
ট্রাম্পের 'বোর্ড অফ পিস' গত মাসে ঘোষণা করেছিল যে, তারা গাজায় হামাস এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর 'সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ'-এর জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। এই ১৫-দফা পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনাদের গাজা থেকে প্রত্যাহার করতে হবে এবং একটি নতুন বেসামরিক ফিলিস্তিনি প্রশাসনের অধীনে গাজার পুনর্গঠন সাধন করতে হবে। তবে, গত সপ্তাহে ইসরায়েল এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানায় যে, তারা হামাসের পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সেনা প্রত্যাহার করবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রস্তাবের প্রতি ইসরায়েলের অনমনীয় মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়।
জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে খলিল আল-হায়্যার এই বৈঠক গত বছরের গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর এই স্তরের প্রথম সরাসরি আলোচনা বলে জানা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বৈঠকে 'বোর্ড অফ পিস'-এর দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ এবং যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া, মিশর, কাতার এবং তুরস্কের প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেন, যারা দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রচেষ্টায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছেন। যদিও এই আলোচনা থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে, হামাসের অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং মানবিক সহায়তার বিষয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েই মূলত আলোচনা হয়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন যে, চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রথমে হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ অপরিহার্য। গত সপ্তাহে তিনি বলেন, "ইসরায়েল বোর্ড অফ পিসের গাজা সংক্রান্ত ১৫-দফা নথি প্রত্যাখ্যান করছে। হামাস সত্যিকার অর্থে নিরস্ত্রীকৃত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) কোনো প্রত্যাহার করবে না।" তার এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি উদ্যোগের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। রবিবার মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, জর্ডান, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং ইন্দোনেশিয়া একটি যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের এই প্রত্যাখ্যানের নিন্দা জানিয়ে বলেছে যে, এটি ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টাকে বিপন্ন করছে।
গত বছরের ১০ অক্টোবর যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তা এখনো বহাল রয়েছে। তবে, এরপর থেকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী গাজায় বেশ কয়েকটি হামলা চালিয়েছে। সর্বশেষ খান ইউনিস এবং নুসেইরাত এলাকায় "সন্ত্রাসীদের" লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ধরনের ঘটনাগুলো শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। কুশনার মিশরে অবস্থানকালে সেদেশের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গেও বৈঠক করেন, যা আঞ্চলিক সমর্থন আদায়ের একটি প্রচেষ্টা।
এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস পরিচালিত দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলার মাধ্যমে, যেখানে প্রায় ১,২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল। ইসরায়েল এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় গাজায় একটি ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে, যার ফলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে এ পর্যন্ত ৭৩,০০০ এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের মতে, এই পরিসংখ্যান নির্ভরযোগ্য। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজার প্রায় ১.৯ মিলিয়ন মানুষ, যা মোট জনসংখ্যার ৯০%, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ট্রাম্পের ১৫-দফা গাজা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান সম্ভবত চূড়ান্ত কথা নয়, বরং এটি আলোচনার একটি জটিল পর্যায়কে নির্দেশ করে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো এবং সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি গাজার সাধারণ মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন নিশ্চিত করা এই শান্তি প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সকল পক্ষের মধ্যে আস্থা ও বোঝাপড়া তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, যা এই অঞ্চলের ভবিষ্যত নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।