দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ধারাবাহিক বিমান হামলায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার (১৫ আগস্ট) ভোর থেকে শুরু হওয়া এই হামলায় নারী ও শিশুসহ কমপক্ষে ১১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এছাড়া আরও ১২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। এই আকস্মিক হামলা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি করেছে।
হতাহতের ঘটনাটি ঘটেছে মূলত দক্ষিণাঞ্চলীয় আনসার শহরের উপকণ্ঠে একটি আবাসিক বাড়ি এবং দেইর আল-জাহরানি এলাকার একটি ভবনে। ইসরায়েলি বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু হওয়া এই দুটি স্থানেই বেসামরিক নাগরিকদের উপস্থিতি ছিল বলে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশুও রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
এই বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা এবং বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে লেবাননের শক্তিশালী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ। সংগঠনটি ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীকে 'নৃশংস গণহত্যা' চালানোর অভিযোগ এনেছে। একই সাথে, লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসন এবং সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের উপযুক্ত ও কঠোর জবাব দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে হিজবুল্লাহ।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, হিজবুল্লাহর হামলায় তাদের তিন সেনা গুরুতর আহত হওয়ার পর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা হিজবুল্লাহর একটি সদর দপ্তরকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। তবে, তারা স্বীকার করেছে যে হামলার সময় ওই লক্ষ্যবস্তুতে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন, যা বেসামরিক হতাহতের কারণ হতে পারে।
রবিবার (১৬ আগস্ট) সকালে আল জাজিরা কর্তৃক যাচাইকৃত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, নাবাতিয়েহ জেলার আলি আল-তাহের হাইটস এবং দাবশা এলাকার মধ্যবর্তী অঞ্চলে ব্যাপক আগুন ও ধোঁয়া উঠছে। একই সাথে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দও শোনা গেছে। আল-মানার টিভি জানিয়েছে, ওই এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলার কারণেই এই বিস্ফোরণগুলো ঘটেছে। নাবাতিয়েহ চ্যানেলের খবর অনুযায়ী, কফর রেমান শহরের আশপাশেও নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে।
হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা, বিশেষত বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং হামলার এলাকা বিস্তৃত করা, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর যুদ্ধ আরও তীব্র করার ইচ্ছার প্রতিফলন। হিজবুল্লাহর মতে, এর মূল উদ্দেশ্য হলো নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করা, আসন্ন নির্বাচনী স্বার্থ হাসিল করা এবং উগ্র ডানপন্থী ভোটারদের সন্তুষ্ট করা।
তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী দপ্তরের মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান বার্তা সংস্থা এএফপিকে এই হামলার ভিন্ন এক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই সামরিক অভিযানগুলো লেবাননের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করার সুযোগ তৈরি করবে, এর বিপরীতটা নয়। তার মতে, ইসরায়েল লেবাননের সঙ্গে একটি নতুন এবং আরও উচ্চাভিলাষী আলোচনায় বসতে আগ্রহী, যা দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আনতে পারে।
উল্লেখ্য, গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তি অনুযায়ী, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার বিষয়টি যাচাই না হওয়া পর্যন্ত লেবাননের সেনাবাহিনীকে লেবাননের পুরো ভূখণ্ডে কার্যকর সার্বভৌম কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই শর্ত পূরণ হলে ইসরায়েলি বাহিনী ধাপে ধাপে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ ছিল।
কিন্তু এই চুক্তিকে শুরু থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে হিজবুল্লাহ। সংগঠনটির প্রধান নাইম কাসেম স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, এই চুক্তি ইসরায়েলি আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে এবং লেবাননের সার্বভৌমত্বকে সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করবে। তার মতে, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে লেবাননের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, যা উভয় পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাস ও সংঘাতকে আরও ঘনীভূত করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা আবারও চরমে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া শান্তি প্রক্রিয়া যেখানে থমকে গেছে, সেখানে নতুন করে শুরু হওয়া এই সামরিক সংঘাত আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে।