কোক স্টুডিও বাংলার চতুর্থ সিজনের দ্বিতীয় গান 'মেঘ' মুক্তির পর থেকেই দেশের সংগীত অঙ্গনে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী কবিতা 'সোনার তরী'-র এই নতুন সংগীতায়োজন নিয়ে শ্রোতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিশেষ করে, গানটির আধুনিক উপস্থাপনা নিয়ে অনেকেই আপত্তি তুলেছেন, যার ফলস্বরূপ সংগীত পরিচালক অর্ণবকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
এই বিতর্কের আবহে অর্ণব নিজে নীরব থাকলেও, তার স্ত্রী এবং সহকর্মী সংগীতশিল্পী সুনিধি নায়েক অবশেষে মুখ খুলেছেন। তিনি সম্প্রতি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ পোস্টের মাধ্যমে শিল্পীদের প্রতি সম্মান ও সহনশীলতা প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। সুনিধির এই বার্তা শুধু অর্ণবের পাশে দাঁড়ানোই নয়, বরং শিল্পের স্বাধীনতা এবং সমালোচনার সীমা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
নিজের পোস্টে সুনিধি নায়েক অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, একজন শিল্পীও একজন মানুষ এবং তার প্রতিটি সৃষ্টি যে সবার ভালো লাগবে, এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। তিনি লেখেন, “কিছু গান হৃদয়ে গেঁথে যায়, কিছু গান হয়তো ছুঁয়ে যেতে পারে না। এটাই শিল্পের স্বাভাবিক নিয়তি।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি শ্রোতাদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা কাজের সমালোচনা করেন, কিন্তু কোনোভাবেই শিল্পীকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত না করেন।
সুনিধি তার স্বামী অর্ণবের দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ সংগীতজীবনের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, 'মাঝে মাঝে', 'আধেক ঘুমে', 'কান পেতে রই', 'মেঘ বলেছে যাব', 'প্রচণ্ড গর্জনে'-এর মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গান অর্ণব শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন। তবে, তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, একজন শিল্পীর সব গান সমানভাবে শ্রোতাদের ভালো নাও লাগতে পারে এবং এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়।
তিনি আরও যোগ করেন, “হ্যাঁ, তার সব গান সমান ভালো হয়নি, হবেও না। কারণ, তিনি মানুষ, যন্ত্র নন।” সুনিধির এই বক্তব্য শিল্পীর মানবিক দিকটি তুলে ধরে এবং বোঝাতে চায় যে, একজন শিল্পী কেবল তার সেরা কাজগুলো দিয়েই বেঁচে থাকেন না; তার ব্যর্থতাগুলোও তার সৃজনশীল যাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি সতর্ক করে দেন যে, যদি প্রতিটি অপছন্দের কাজের জন্য শিল্পীকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান বা বিদ্রূপ করা হয়, তাহলে সেই শিল্পী একদিন নতুন কিছু সৃষ্টি করার সাহস হারিয়ে ফেলবেন।
সুনিধি নায়েকের ভাষায়, এই ধরনের নির্মম সমালোচনার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। তিনি বলেন, “তারপর একদিন, যখন তিনি নীরব হয়ে যাবেন, যখন নতুন গান আর আসবে না, তখন আবার আমরাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলব, শিল্পীটা হারিয়ে গেল কেন?” এই প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি সমাজের প্রতি আঙুল তোলেন এবং বোঝাতে চান যে, শিল্পীরা হারিয়ে যান না, বরং আমাদের নির্মমতা দিয়েই তাদের হারিয়ে দেওয়া হয়।
পোস্টের শেষদিকে সুনিধি নায়েক তার মূল বার্তাটি আবারও জোর দিয়ে তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, “সমালোচনা করুন, কিন্তু সম্মানটুকু অটুট রাখুন। কারণ একজন শিল্পী কোনো দেবতা নন, তিনি আমাদেরই মতো একজন মানুষ। তারও অনুভূতি আছে, কষ্ট আছে এবং ভালোবাসা দিয়ে সৃষ্টি করে যাওয়ার স্বপ্ন আছে।” এই আহ্বান শিল্পের প্রতি সম্মান এবং শিল্পীর ব্যক্তিগত অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ জুন প্রকাশিত কোক স্টুডিও বাংলার 'মেঘ' গানটির সংগীতায়োজন করেছেন অর্ণব। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন মোহাম্মদ শোয়েব, মাশা ইসলাম ও মৌসুমী দত্ত। শাস্ত্রীয় সংগীত, আধুনিক সাউন্ড এবং হিপহপের সংমিশ্রণে তৈরি এই গানটি প্রকাশের পর থেকেই ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সোনার তরী' কবিতার নতুন উপস্থাপনা নিয়ে অনেকেই আপত্তি জানালেও, সুনিধি নায়েকের এই বার্তা শিল্পীদের প্রতি সম্মান বজায় রাখার একটি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা সংগীত জগতে বিতর্কের পাশাপাশি সহনশীলতার গুরুত্বকেও সামনে নিয়ে এসেছে।